‘ইকির মিকির চাম-চিকিড়,/চামের কাঁটা মজুমদার...।’ ছোটবেলার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই ছড়া। দশ আঙুল মাটিতে ছড়িয়ে ছড়া আওড়ে চলত খেলা! শোনা যায়, এই ছড়ার নেপথ্যে রয়েছে এক করুণ কাহিনি।
‘ইকির মিকির চাম-চিকিড়,/চামের কাঁটা মজুমদার...।’ ছোটবেলার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই ছড়া। দশ আঙুল মাটিতে ছড়িয়ে ছড়া আওড়ে চলত খেলা! শোনা যায়, এই ছড়ার নেপথ্যে রয়েছে এক করুণ কাহিনি।
ইকির বা ‘ইকড়ি’-র অর্থ সংসারের খরচ জোগাড়ের জন্য সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করা। কিন্তু, তাতেও প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় না হলে প্রয়োজন পড়ত মিকির বা ‘মিকড়ি’র। অর্থাৎ বাড়তি উপার্জনের চেষ্টা। ‘চাম’ মানে কাজের জায়গা। আর চিকির বা ‘চিকড়ি’ কথার অর্থ, ওই স্থান ঘুরে অর্থ বা ফসল উপার্জন করে নিয়ে আসা। তারপরও স্বস্তি নেই। কারণ, সাদাসিধে জীবনে বাধ সাধে ‘চামের কাঁটা মজুমদার’! এই ‘মজুমদার’রা আসলে রাজকর্মচারী। তাদের কাজ ছিল খাজনা আদায়। আর সেই কাজ করতে গিয়েই দরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নিত তারা। এরপরই ‘ধেয়ে এল’ ফড়ের দল—‘দামোদর’। এরা ফসল বা অন্যান্য সামগ্রী অত্যন্ত কম মূল্যে কিনে চড়া দামে বিক্রি করত। আরও একদফা শোষণের মুখে পড়তে হতো দুঃস্থ মানুষদের। এরপর যেটুকু চাল বা শস্য বাঁচানো গিয়েছে, দোরে বসে তা দিয়েই রান্নার প্রস্তুতি নেওয়া হতো। ছড়ায় এই ঘটনাটিই লেখা হয়েছে ‘দাওয়ায় বসে চাল কাঁড়ি’তে। কিন্তু, সকাল থেকে হাজারো ঝক্কি সামলে সেই রান্না হতেও দেরি হয়ে যায়। সকালে কোনও খাবার জোটেনি। মধ্যাহ্নভোজ সারতেও বেলা গড়িয়ে দুপুর। ‘ভাত খাওগে দুপুরবেলা’। শান্তি নেই দু’মুঠো খেতে বসেও। কারণ ‘ভাতে পড়ল মাছি’। এখানে মাছি অর্থাৎ চোরকে বোঝানো হয়েছে। বিহিত চাইতে প্রশাসনের দ্বারস্থ হতো কেউ কেউ। ছড়াকার লিখেছেন, ‘কোদাল দিয়ে চাঁছি।’ এখানে কোদাল অর্থে পুলিসকে বোঝানো হয়েছে। তাতেও লাভ নেই। কারণ, ‘কোদাল হল ভোঁতা’। অর্থাৎ পুলিসের কাছে গিয়ে উল্টে আরও হেনস্তার মুখে পড়তেন অভিযোগকারী! অগত্যা— ‘খা কামারের মাথা’। এখানে লাইনটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কোদাল তৈরি করে কামার। এখানে কোদাল বলতে প্রশাসনকে বোঝানো হয়েছে। কামার অর্থে পুলিসের নিয়োগকর্তাকেই নিশানা করেছেন ছড়াকার। এর মর্মার্থ, ওই কর্তাব্যক্তিদের কাছে গিয়ে মাথা কুটে কাঁদতে হতো হতদরিদ্র মানুষগুলিকে।