


রাজদীপ গোস্বামী, মেদিনীপুর: পরিবর্তন হোক কিংবা প্রত্যাবর্তন—বাজনা বাজবেই। হিন্দি গানের তালে সিং বাজবে, তাসা বাজবে, বাজবে কাঁসরও। বিজেপি হারলেও বাজবে। তৃণমূল জিতলেও বাজবে!
মেদিনীপুর শহরের এক পরিচিত বিজেপি নেতার এমন শর্ত শুনে প্রথমে বেশ ভিমড়ি খেয়ে গিয়েছিলেন নিমতলা চক এলাকার বাজনা শিল্পীরা। বায়না নিতে খানিক কুণ্ঠিতও ছিলেন তাঁরা। দু’দলে বাজনা বাজিয়ে যদি টাকা না মেলে! ওই নেতা আশ্বস্ত করে বলেন, ‘টাকা-পয়সা নিয়ে একদম চিন্তা করিস না। পেমেন্ট তো করব আমি।’ তবুও যেন ঘোর কাটছিল না শিল্পীদের। রহস্য খুঁড়তে গিয়ে তাঁদের একজন বলেই ফেললেন, ‘বাবু, আমরা কি তা হলে আপনার বাড়িতেই চলে যাব?’ জবাবে ব্যবসায়ী ওই নেতা বললেন, ‘বিজেপি জিতলে আমার ওয়ার্ডে বাজনা বাজবে। আর তৃণমূল জিতলে আমার শ্বশুরবাড়ির ওয়ার্ডে!’ এরপরই শিল্পীদের কাছে স্পষ্ট হয়, ভদ্রলোক বিজেপি করলেও ফলাফল নিয়ে বেশ ধন্দে। তাই তিনি দু’কূল রক্ষা করতে বাজনাপার্টি বায়না করছেন।
এবার বাংলার নির্বাচন বেশ অন্যরকম। ‘শান্তিপূর্ণ’ ভোট হলেও মাটির কাছাকাছি থাকা রাজনৈতিক নেতারাও বুঝে উঠতে পারছেন না, আজ কী ঘটতে চলেছে। রসিকতা করে বাজনা শিল্পীরা বলছিলেন, ‘ওই নেতার মতো যুযুধান দু’পক্ষের অনেক নেতাই উঠে পড়েছেন পাঁচিলে। সুযোগ বুঝে পিঠ বাঁচাবেন।’
মেদিনীপুর শহরের নিমতলা চক এলাকায় বংশ পরম্পরায় বাজনা শিল্পীরা থাকেন। বছরের পর বছর ধরে নানা অনুষ্ঠানে, পুজোয় বাজনা বাজিয়ে আসছেন তাঁরা। বর্তমানে এই এলাকায় প্রায় কমবেশি একশোর বেশি বাজনা শিল্পীর পরিবার রয়েছে। বাজনা বাজানোর পাশাপাশি অন্যান্য কাজের সঙ্গেও যুক্ত। ভোট এলে তাঁদের একটু বাড়তি কদর বাড়ে। মেদিনীপুর ছাড়াও অন্যান্য আশেপাশের বিধানসভা এলাকা থেকেও বায়না আসে। এবার ভোটেও শিল্পীদের বায়না বেশ ভালোই হয়েছে। হাসি ফুটেছে শিল্পীদের মুখে। সিং বাজনা শিল্পী বিকাশ রাসা বলছিলেন, ‘পুজোর সময় আয় ভালোই হয়। এবছর ভোটে বাড়তি উপার্জন হয়েছে সকলেরই। প্রচারের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বাজানোর জন্য ডেকেছিল। ভোটের ফলাফল ঘিরেও অনেক বায়না আসছে।’
নিমতলা চকের এক শিল্পীর মুখ থেকেই শোনা বিজেপি নেতার ওই অভিনব বায়নার কথা। তিনি বলছিলেন, ‘দিন কয়েক আগে বাজনা পাড়ায় আসেন শহরের এক বিজেপি নেতা। বাজনা শোনার পর বায়না করেন। কিন্তু তাঁর শর্ত শুনে তাজ্জব হয়ে যাই সকলেই। তিনি আমাদের বলেন, মেদিনীপুর বিধানসভায় বিজেপি জিতলে নিজের ওয়ার্ডের গেরুয়া শিবিরের কর্মীদের জন্য বাজনার ব্যবস্থা করে রাখছেন। তৃণমূল জিতলে শ্বশুরবাড়ির ওয়ার্ডের তৃণমূল কর্মীদের জন্য একই বাজনা বাজাতে হবে।’ অর্থাৎ, ফল যেদিকেই যাক, বাজনা যেন বন্ধ না থাকে—সেই প্রস্তুতি আগেভাগেই নিয়ে রেখেছেন ওই গেরুয়া নেতা। এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও চাপা হাসাহাসি শুরু হয়েছে। বাজনা শিল্পীদের একাংশ মজার ছলে বলছেন, ‘এবার নেতারাও বুঝতে পারছেন না, হাওয়া কোনদিকে বইছে! তাই সব দরজা-জানলা খোলা রাখতে চাইছেন।’ তবে, মেদিনীপুরের বিজেপি প্রার্থী শঙ্কর গুছাইত বেশ আত্মবিশ্বাসী। তিনি রবিবার বলেন, ‘আগামীকালের জন্য আমরা প্রস্তুত। বিজয় মিছিলও হবে। বাজনাও বাজবে। বেশিরভাগ আসনে তৃণমূল হারবে।’ মেদিনীপুরের তৃণমূল প্রার্থী সুজয় হাজরা বলেন, ‘আমরাও সব দিক থেকে প্রস্তুত। বাংলার মানুষের উপর ভরসা রয়েছে। বিজেপিকে মানুষ সব উত্তর দিয়ে দেবে। হওয়া যেদিকেই থাকুক, শেষে জিতবে বাংলা।’