নয়াদিল্লি: আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের। আর সেই আইন মেনে মানুষকে ন্যায়বিচার দেওয়ার দায়িত্ব আদালতের। কিন্তু এই দুই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানই যদি গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, সেক্ষেত্রে উপায় কী? এসআইআর পর্বে দেশে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই প্রশ্নটাই। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান বিচারপতি উজ্জ্বল ভুয়ান থেকে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আর এফ নরিম্যান একবাক্যে সরব হয়েছেন এই ইস্যুতে। প্রথমজন সরাসরি পশ্চিমবঙ্গে ৯০ লক্ষ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাতিল করার প্রসঙ্গ তুলে বলেছেন, এটা সংবিধানের উপর আঘাতের শামিল। কোনো অজুহাতেই বৈধ ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যায় না। এটা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারিতা। দ্বিতীয়জন সুর আরও চড়িয়েছেন, ভোটার তালিকা থেকে যেভাবে সাধারণ নাগরিকদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে তা পুরোপুরি বেআইনি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দু’জনেই নিশানা করেছেন নির্বাচন কমিশন, বলা ভালো মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে। এবার একইভাবে আক্রমণ শানালেন সুপ্রিম কোর্টের আরও এক প্রাক্তন বিচারপতি ক্যুরিয়েন জোসেফ। সমাজবাদী নেতা রামমনোহর লোহিয়ায় মন্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে তাঁর সাফ বক্তব্য— ‘যখন সংসদ ও আদালত ব্যর্থ হয়, তখন রাজপথই একমাত্র রাস্তা। জনগণকেই রাস্তায় নেমে গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হবে।’
এসআইআরে অনিয়মের ইস্যুতে গোটা দেশ এখন উত্তাল। প্রতিদিন রাজধানীর রাজপথে নামছে বিরোধীরা। মাটি কামড়ে লড়াই করছে ককরোচ, জেন জি, ছাত্র-যুবরা। প্রথমে দাবি ছিল একটাই— মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা চাই। ধীরে ধীরে আন্দোলনের অভিমুখ ঘুরছে শাসক বিজেপি এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দিকে। বিচারব্যবস্থার মধ্যে থেকেও নানা প্রশ্ন উঠছে। এই আবহে প্রাক্তন বিচারপতি ক্যুরিয়েন জোসেফের মন্তব্য শোরগোল ফেলে দিয়েছে। সম্প্রতি কেরল হাইকোর্টের চেম্বার কমপ্লেক্সে একটি সাংবিধানিক আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব লইয়ার্স-এর কেরল শাখা। আলোচ্য বিষয় ছিল, ‘ভারতের নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার সঙ্গে কি আপস করা হচ্ছে?’ সেখানে প্রাক্তন বিচারপতি ক্যুরিয়েন সাফ জানিয়েছেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সুপ্রিম কোর্টকে তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতেই হবে। সংসদ ও বিচার বিভাগ গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হলে জনগণকে শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে হবে। সরাসরি জ্ঞানেশ কুমার নিয়ে তিনি অবশ্য কিছু বলেননি। তবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভুয়ানের সুরে প্রাক্তনী ক্যুরিয়েনেরও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, উচ্চপদে থাকা ব্যক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আর স্বাধীন বলা যায় না। এধরনের ঘটনা ভারতের গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক!
অথচ স্বাধীন সংস্থা হিসাবেই তৈরি করা হয়েছিল নির্বাচন কমিশনকে। তাদের বিরুদ্ধেই এসআইআরের নামে কোটি কোটি মানুষের নাম বাদ দিয়ে বিজেপি তথা মোদি-শাহের সুবিধা করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্বয়ং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সেই অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে। এক্ষেত্রে কী করণীয়? এব্যাপারে প্রাক্তন বিচারপতির পরামর্শ, ‘নিয়োগ ও চাকরির শর্তকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। সংসদের হাতে সব ছেড়ে না দিয়ে সংবিধান সংশোধনই সঠিক পথ।’ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টকে সক্রিয় হওয়ার অনুরোধ করেছেন ক্যুরিয়েন। জানিয়েছেন, ‘প্রবাদে শোনা যায়, যত গর্জায়, তত বর্ষায় না। কিন্তু, সংবিধানের অভিভাবক সুপ্রিম কোর্টের ক্ষেত্রে তা চলবে না। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার কোনো ব্যক্তিবিশেষ নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। আর সুপ্রিম কোর্ট হল সংবিধানের পাহারাদার। আর পাহারাদারের হুঁশিয়ারিতে কাজ না হলে ‘কামড়’ তো দিতেই হবে।’



