মঞ্চের চারপাশে হ্যাজাক জ্বলছে। সেই আলোতেই চলছে যাত্রা। একটা সময় এভাবেই আয়োজিত হতো বিভিন্ন অপেরার যাত্রাপালা। পরবর্তী সময়ে সেই ধারা বদলে যায়। আসে বৈদ্যুতিক আলো। টিনের কৌটোর মধ্যে জোরালো বাল্বের সাহায্যে আলো ব্যবহারে কিছুটা পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়। তাতে কিছুটা সাড়াও মিলেছিল। তবে যাত্রায় বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে বৈদ্যুতিক আলোর প্রয়োগে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন তাপস সেন। যাত্রাকে বাস্তবানুগ চেহারা দিতে বৈদ্যুতিক আলোর ভূমিকা যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, ছয়ের দশকে তা একেবারে হাতে কলমে দেখিয়ে ছিলেন তিনি। ১৯৬২ সালে, রবীন্দ্রকাননে বিশ্বরূপা নাট্য উন্নয়ন পরিকল্পনা পরিষদ আয়োজিত প্রথম যাত্রা উৎসবে এই আলোক-আঙ্গিকের প্রবর্তন করেন তিনি। এরপর ১৯৬৯ সালে যাত্রায় আলোর গুরুত্ব অনুধাবন করে ‘সূর্যসেন’ পালার জন্য তাপস সেনের প্রতিভাকে কাজে লাগায় ভারতী অপেরা। আচমকা যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সাইক্লোরামা, কম্পিউটারাইজড সাইক্লোরামা, হাই-ফাই সাইক্লোরামার মতো বিষয়। আলোর বিস্ময়কর যাদুতে বেশ কিছুটা ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েছিলেন তৎকালীন চিৎপুরের যাত্রা মালিকরা। পরবর্তীতে ওড়িশার একাধিক আলো ব্যবসায়ীও কলকাতায় আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। পালার প্রয়োজনে ধীরে ধীরে আলো ব্যবহারে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে থাকে বিভিন্ন যাত্রা প্রতিষ্ঠানগুলি। ফলে যাত্রাপাড়ায় একে একে বহু আলো-শিল্পীর আবির্ভাব ঘটে। তৈরি হয় আলোকসম্পাত বিভাগ। তাপস সেন যেমন বিভিন্ন যাত্রা কোম্পানির আমন্ত্রণে একাধিক যাত্রাপালাকে বিজ্ঞানসম্মত আলোর মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তেমনই কনিষ্ক সেন, ভানু বিশ্বাসের মতো আলোক শিল্পীরাও প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন। গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষের ‘৩০০ বছরের যাত্রা শিল্পের ইতিহাস’ গ্রন্থ লিখেছেন—‘তাপস সেন ও কনিষ্ক সেন। আলোক শিল্পের জগতে এই দুই দিকপাল মূলত যাত্রার রিহার্সালে নিজেরা উপস্থিত থেকে আলোক প্রয়োগ এবং নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটি পাকা করে দিতেন। পরে ঠিক সেই নির্দেশ মতো যাত্রার আসরে আলোক নিয়ন্ত্রণ করতেন নির্বাচিত কর্মীরা।’



