নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি, সংবাদদাতা বোলপুর ও রামপুরহাট: শনিবার ভোরে বেজে উঠল দেবীপক্ষের আগমনি সুর। শাস্ত্রীয় বিশ্বাস, এই পুণ্যলগ্নে উত্তরসূরিদের হাত থেকে জল পেতে মর্ত্যধামে আসেন পিতৃপুরুষরা। সেই বিশ্বাসকে পাথেয় করেই শনিবার মহালয়ার ভোরে বীরভূম জেলার নদীঘাটগুলিতে ঢল নেমেছিল অগণিত পুণ্যার্থীর। তবে জেলার অন্যত্র নির্বিঘ্নে তর্পণ মিটলেও সিউড়ির ছবিটা ছিল একেবারেই ভিন্ন। স্থায়ী ঘাটের অভাবে সেখানে পুণ্যার্থীদের পিতৃপুরুষের জলদান সারতে হল জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।
বর্ষার সময় কয়েকবার জল ছাড়া হলেও সিউড়িতে তিলপাড়া জলাধারের ডাউনস্ট্রিমে বর্তমানে মেরামতির কাজ চলছে। প্রায় কোনো বছরই ডাউনস্ট্রিমে জল থাকে না। তারজন্য আপস্ট্রিমে তর্পণ করতে যান অধিকাংশ শহরবাসী। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, সেখানে পুণ্যার্থীদের জন্য কোনো স্থায়ী বা সুরক্ষিত ঘাট নেই। জলাধারের ধারে কিছু অংশে কয়েকটি সিঁড়ির ধাপ থাকলেও মহালয়ার বিপুল ভিড়ে সেখানে ঠাঁই পাওয়া কঠিন। বাধ্য হয়েই বহু মানুষকে এবড়োখেবড়ো বোল্ডার টপকে, পা পিছলে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি নিয়ে অনেকটা নীচে নদীর জলে নামতে হয়। দুর্ঘটনার আতঙ্কে বয়স্কদের অনেকেই এদিন নদীতে না নেমে নিজেদের মতো করে তর্পণ সেরেছেন।
ঘাটে ঘাটে পর্যাপ্ত পুলিশ ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী মোতায়েন থাকলেও সিউড়িবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি একটি স্থায়ীঘাটের। স্থানীয় বাসিন্দা দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভদীপ চক্রবর্তী ক্ষোভের সুরে বলেন, প্রতি বছরই আমাদের এই চরম ঝুঁকি নিয়ে তর্পণ করতে হয়। প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি, তর্পণের জন্য অবিলম্বে একটি সুরক্ষিত ও স্থায়ীঘাটের ব্যবস্থা করা হোক।
সিউড়ির এই ভোগান্তির চিত্র বাদ দিলে, জেলার অন্যান্য প্রান্তে তর্পণ পর্ব মিটেছে ভক্তিভরেই। রামপুরহাট মহকুমার তারাপীঠের দ্বারকা নদ থেকে শুরু করে নলহাটির ব্রাহ্মণী নদীর জগধারী গ্রাম ও আকালিপুর ঘাট, মুরারইয়ের বাঁশলৈ এবং ময়ূরেশ্বরের ময়ূরাক্ষী নদীর ঘাটে সকাল থেকেই ছিল উপচে পড়া ভিড়। আকালিপুরে তর্পণ করতে আসা মহাদেব পাল বলেন, দেবীপক্ষের আগের কৃষ্ণ প্রতিপদে পিতৃপুরুষরা মর্ত্যে নেমে আসেন। তাঁদের তৃপ্ত করতেই আমাদের এই জলদান।
বোলপুরের কঙ্কালীতলা মন্দির সংলগ্ন কোপাই নদী, গোয়ালপাড়ার ঘাট এবং নানুরের বাহিরি সংলগ্ন অজয় নদেও ভিড় জমায় বহু মানুষ। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে জেলার জনবহুল প্রতিটি ঘাটেই পুলিশ ও সিভিক ভলান্টিয়ার মোতায়েন ছিল।
বর্ষার পর ময়ূরাক্ষী কিংবা অজয়ের বুকে সেভাবে স্রোত বা জল নেই ঠিকই, কিন্তু অবৈধ বালি খাদানের জেরে নদী গর্ভে যত্রতত্র তৈরি হয়েছে বিশাল মরণফাঁদ। ফলে ময়ূরাক্ষী কিংবা অজয়ের তীরবর্তী বহু গ্রামের মানুষ চোরাগর্তের আতঙ্কেও অনেকে নদীতে নামার সাহস দেখাননি।



