দেবী সরস্বতী বাল্মিকীকে কৃপা করেছিলেন। তাই তিনি দস্যু রত্নাকর থেকে মহাকবি হয়ে উঠেছিলেন। কবি কালিদাসও কবিত্বশক্তি লাভ করেছিলেন বাগদেবীর আশীর্বাদে। মধ্যযুগে এবং আধুনিক যুগে বহু কবি তাঁদের কাব্য রচনার শুরুতেই দেবী সরস্বতীর বন্দনা করেছেন। রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কিংবা রূপরাম চক্রবর্তীর ‘ধর্মমঙ্গল’ কাব্যে দেবীবন্দনা দেখতে পাই। এমনকী কবি মধুসূদন দত্তও তাঁর ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’ শুরু করেছিলেন সরস্বতী বন্দনা দিয়ে। ‘ডাকি আবার তোমায়, শ্বেতভুজে ভারতী।’ আসলে বাঙালি মনে করে দেবী সরস্বতীর আশীর্বাদ ছাড়া আমাদের শিক্ষালাভ সম্ভব নয়, জ্ঞানী হওয়া সম্ভব নয়। তাই বাঙালি যেমন ধনদেবীর কাছে তার সন্তানের দুধেভাতে বেঁচে থাকার প্রার্থনা জানায়, তেমনই দেবী সরস্বতীর সামনে অর্থাৎ বসন্ত পঞ্চমীতে বাগ্দেবীর সামনে সন্তানদের সুশিক্ষা কামনা করে। পড়ুয়ারা মায়ের চরণে তাদের পাঠ্যপুস্তক রেখে প্রার্থনা করে বিদ্যা ও জ্ঞানের। সরস্বতী পুজোয় ‘হাতেখড়ি’ একটা বিশেষ অনুষ্ঠান। শিশুরা প্রথম সেইদিন পুরোহিতের হাত ধরে খড়ির সাহায্যে স্লেটে আঁক কেটে লেখে ‘অ আ ক খ’। এভাবেই দেবীর সামনে শুরু হয় জ্ঞানালোকের সন্ধানে শিশুর প্রথম পদক্ষেপ। আঁক কষার সময় পুরোহিত মন্ত্রোচ্চারণ করেন, ‘পঞ্চম্যাং পূজেয়েল্লক্ষ্মীং পুষ্পধূপান্নবারিভিঃ। / মস্যধারং লেখনীঞ্চ পূজয়েন্ন লিখেত্তৎঃ ।। / মাঘে মাসি সিতে সিতে পক্ষে পঞ্চমী যা শ্রিয়ঃ প্রিয়া। / তস্যা পূর্ব্বাহ্ন এবেহ কার্য সারস্বতোৎসব।।’ সরস্বতী শিল্পকলারও দেবী। তাই শুধু বিদ্যালাভই নয়, প্রতিটি অভিভাবক চান এই হাতেখড়ি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তাঁর সন্তান দেবীর কৃপা লাভ করুক। তার মধ্যে সঙ্গীত ও শিল্পকলার দক্ষতাও গড়ে উঠুক। প্রতিটির বাঙালির তাই বিদ্যারম্ভ হয়েছে কোনও এক সরস্বতীর পুজোর দিন হাতেখড়ির মাধ্যমে। যুগ যুগ ধরে সেই অনুষ্ঠান পালিত হয়ে আসছে। আগামী দিনেও হবে। তবে কাঁথির সরস্বতী মন্দিরে সারা বছর ধরে শিশুদের হাতেখড়ির ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে অভিভাবকরা কোনও শুভদিনে তাঁদের সন্তানদের জন্য হাতেখড়ির ব্যবস্থা করেন।



