নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া: ঘিঞ্জি গলির মধ্যে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দু’টি পাঁচতলা পুরানো আবাসন। জীর্ণ দেওয়াল থেকে খসে পড়ছে পলেস্তরা। সংকীর্ণ সিঁড়ির কংক্রিট ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে লোহার রড। কোথাও বিপজ্জনকভাবে ঝুলছে বিদ্যুতের খোলা তার। আর সেই আবাসনের প্রতিটি তল জুড়ে চলছে একের পর এক লজ। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা দূরঅস্ত, ট্রেড লাইসেন্সই নেই তাদের। হাওড়া স্টেশন সংলগ্ন ডবসন রোডের এই ছবি ফের বেআব্রু করে দিল শহরের হোটেল-লজগুলির নিরাপত্তাকে।
তারাপীঠের পর কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিট। আগে এই রাস্তার নাম ছিল ফ্রি স্কুল স্ট্রিট। মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু মিছিলের ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে হাওড়া স্টেশন লাগোয়া হোটেল-লজগুলির নিরাপত্তা নিয়ে। ডবসন রোড ছাড়াও আইসি বোস রোড, কিংস রোড, মুখরাম কানোরিয়া রোড মিলিয়ে স্টেশন ও বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় এমন হোটেল-লজের সংখ্যা ২৫০টিরও বেশি। অধিকাংশেরই নেই ন্যূনতম অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম, এমনকি পর্যাপ্ত জলের ব্যবস্থাও নেই। ঘিঞ্জি বিল্ডিংয়ের ভিতরে দেশলাই বাক্সের মতো ছোটো ছোটো ঘরেই গাদাগাদি করে থাকেন বিভিন্ন রাজ্য থেকে হাওড়া স্টেশনে আসা যাত্রীরা। বুধবার দুপুরে ডবসন রোডের ওই দুই আবাসনে গিয়ে দেখা গেল, দু’টি বিল্ডিং মিলিয়ে অন্তত কুড়িটি লজ রয়েছে। প্রতিটি তল যেন এক একটি জতুগৃহ। অজস্র খোলা বিদ্যুৎবাহী তারে সামান্য শর্ট সার্কিট হলে যে বড় বিপদ ঘনিয়ে আসতে পারে, তা স্বীকার করেছেন লজ কর্মীরাই। একটি লজের কেয়ারটেকার নীতেশ কুমারের কথায়, ‘সেফটি ব্যবস্থা এখানে কোনো লজেই নেই। আগুন লাগলে আমরাও মরব, গেস্টরাও মরবেন। কী করা যাবে, এভাবেই চলছে।’ আর এক লজকর্মী মিঠুন দাস বলেন, ‘আগুন নেভানোর যন্ত্র আছে। তবে কাজ করে কি না, বলতে পারব না।’ নিজস্ব চিত্র
স্থানীয় সূত্রের খবর, আবাসনগুলি বেহাল হয়ে পড়ায় কয়েক বছর আগে পরিবারগুলি ফ্ল্যাট বিক্রি করে অন্যত্র চলে যায়। তারপর বেআইনিভাবে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠে ছোটো ছোটো লজ। স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ী রাহুল শোনকারের প্রশ্ন, প্রশাসনের নাকের ডগায় বসতবাড়ির ভিতর কীভাবে হোটেল ব্যবসা চলে? তাঁর দাবি, প্রায় প্রতিটি লজই অবৈধ। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, পুলিশ-প্রশাসন সবই জানে। সময়মতো ‘তোলার টাকা’ও পৌঁছে যায় থানায়। পুরো বিষয়টি ‘সেটেলমেন্ট’। যদিও হাওড়া দমকলের এক পদস্থ কর্তার দাবি, শহরের হোটেলগুলিকে মাঝেমধ্যেই নোটিস দেওয়া হয়, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হয় এবং নিয়মিত ফায়ার অডিট হয়। কিন্তু স্টেশন সংলগ্ন লজগুলির বাস্তব ছবি সেই দাবির সঙ্গে কার্যত বেমানান। এদিকে রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী উমেশ রাই বলেন, হাওড়া স্টেশন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই হোটেল-লজ চলছে। অধিকাংশেরই লাইসেন্স বা ফায়ার লাইসেন্স নেই। কলকাতার ঘটনার পর হোটেলগুলির পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে বিশেষ টিম তৈরি করা হচ্ছে।