


বিশেষ সংবাদদাতা, শিলং: ‘দাদা, আপনার মোবাইলটা একটু দেবেন? একটা ফোন করব!’ রাত তখন একটা। উত্তরপ্রদেশের গাজিপুর। শুনসান ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক বা বারাণসী-গাজিপুর রোডের ধারে কাশী ধাবায় কয়েকজন মাত্র খদ্দের বসে। এমন সময় বিধ্বস্ত অবস্থায় এক তরুণীর আর্জিতে অবাকই হয়েছিলেন ধাবার মালিক সাহিল যাদব। বিনা বাক্যব্যয়ে নিজের মোবাইলটি তুলে দেন তাঁর হাতে। বাড়িতে ফোন করতে করতেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তরুণী যে ১২০০ কিলোমিটার দূরে মেঘালয়ে কী কাণ্ড ঘটিয়ে এসেছেন, ঘুণাক্ষরে টের পাননি ধাবামালিক। পরে তরুণীর ভাই ফোন করে তাঁকে পুলিসে খবর দিতে বলেন। তাতেই সামনে এল হাড়হিম করা এক খুনের ঘটনা... ‘হানিমুন মার্ডার’!
গত ১১ মে ইন্দোরে বিয়ে হয়েছিল সোনম ও রাজা রঘুবংশীর। হানিমুনে তাঁরা মেঘালয় ঘুরতে গিয়েছিলেন। ২০ মে কামাখ্যা হয়ে শিলং পৌঁছন নবদম্পতি। গত ২৩ মে সোহরা বা চেরাপুঞ্জি বেড়াতে গিয়ে হঠাৎ উধাও হয়ে যান দু’জনে। ১১ দিন পর একটি খাদ থেকে উদ্ধার হয় পরিবহণ ব্যবসায়ী রাজার ক্ষতবিক্ষত দেহ। উদ্ধার হয় একটি চপারও। তবে নববধূর কোনও খোঁজ মেলেনি। সিট গঠন থেকে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা, স্নিফার ডগ, ড্রোন—সোনমকে খুঁজতে কিছুই বাদ রাখেনি মেঘালয় পুলিস। তাঁকে অপহরণ করে বাংলাদেশে পাচারের জল্পনা ছড়ায়। কিন্তু এদিন সোনমের খোঁজ পাওয়ার পর যা জানা গেল, তা হার মানাবে থ্রিলার সিনেমা কিংবা ওয়েব সিরিজকেও। মেঘালয় পুলিস জানাল, ‘রাজাকে খুনের মাস্টারমাইন্ড স্বয়ং সোনম! প্রেমিকের সঙ্গে প্ল্যান করেই সে খুন করেছে স্বামীকে।’
রবিবার রাতে গাজিপুরের ওই ধাবা থেকে ফোন পেয়ে সোনমের খোঁজে হাজির হয় পুলিস। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে গ্রেপ্তার হন সোনম। ইন্দোর এবং ললিতপুর থেকে পাকড়াও করা হয় সোনমের ‘প্রেমিক’ রাজ সিং কুশওয়া (২২) ও আরও তিনজনকে। সোনমদের পারিবারিক ব্যবসায় কর্মরত রাজ। তার বাড়ি ইন্দোরেই। সে আর সোনম মিলে রাজাকে খুনের জন্য ১৯ বছরের আকাশ রাজপুত এবং ২২ বছর বয়সি বিশাল সিং চৌহানকে ‘ভাড়া’ করেছিল বলে অনুমান পুলিসের। মেঘালয়ের ইস্ট খাসি হিলসের পুলিস সুপার বিবেক সেইয়েম অবশ্য দাবি করেছেন, পুলিসি তৎপরতার চাপে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছেন সোনম। যদিও মেঘালয় থেকে সোনম কীভাবে উত্তরপ্রদেশে পৌঁছলেন, কেনই বা বাড়িতে ফোন করলেন, সেসব নিয়ে ধোঁয়াশা এখনও কাটেনি। সোনম অবশ্য জানিয়েছেন, স্বামীকে খুনের পর তাঁকে অপহরণ করা হয়েছিল। সোনমকে আনতে উত্তরপ্রদেশে রওনা দিয়েছে মেঘালয় পুলিসের একটি দল।
গোটা ঘটনায় মেঘালয়ে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। পুলিস প্রথমে অন্ধকারে সূত্র হাতড়ালেও শুক্রবার হঠাত্ ‘ব্রেক থ্রু’ মেলে। স্থানীয় এক ট্যুর গাইড পুলিসকে জানান, ২৩ মে ওই দম্পতিকে অন্য তিনজনের সঙ্গে দেখেছিলেন। সকলেই হিন্দিভাষী হওয়ায় তিনি অবশ্য কারও কথা বুঝতে পারেননি। তবে পাঁচজনে তিন হাজার সিঁড়ি ভেঙে নোঙ্গরিআট থেকে মাওলাখিহাট যাচ্ছিলেন। সেই গাইডের দেওয়া সূত্র ধরেই ইন্দোরে তদন্ত করতে যায় মেঘালয় পুলিস। তারপরই ক্রমশ জট খুলতে শুরু করে রহস্যের।
মাত্র সাতদিনের মধ্যে ‘হানিমুন মার্ডার’-এর সমাধানের জন্য পুলিসকে অভিনন্দন জানিয়েছেন মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা। তিনি বলেন, ‘এই ঘটনায় আমাদের রাজ্যের কেউ জড়িত নয়। অথচ মেঘালয় সরকার ও রাজ্যকে অযথা অপমান করা হল।’ রাজার মা উমার দাবি, সোনমই বিমানের টিকিট কেটে হানিমুনে যেতে বাধ্য করেন ছেলেকে। যদিও সোনমের বাবার দাবি, ‘আমরে মেয়ে নির্দোষ। ওকে ফাঁসানো হচ্ছে।’ সিবিআই তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।