খোলা আকাশের নীচে এদিক সেদিক ছড়িয়ে মাকড়া পাথরের তৈরি একাধিক নিবেদন বা মানত শিলা। সেগুলির ঠিক মাঝখানে, একটি শিলার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা প্রাচীন ভগ্নমূর্তি। ইনি নাকি সত্যনারায়ণ দেব! আগে মূর্তির সামনে ছাগবলি হতো। এখন সেসব বন্ধ। তবে নিয়মিত পুজো করেন বাসিন্দারা। পুরোহিত হলেন আদিবাসী সম্প্রদায়ের শবর দেহরী। তিনি যতই দেবমাহাত্ম্য বর্ণনা করুন না কেন, গবেষকদের দাবি, মূর্তিটি জৈনদের ২৪তম তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের।
জায়গাটা ঝাড়গ্রাম। বিনপুর-২ ব্লক। এরগোদা গ্ৰাম পঞ্চায়েতের রাজপাড়া একটি প্রাচীন জনপদ। পড়িহাটী ও রাজপাড়ার মধ্যে দিয়ে বয়ে গিয়েছে বাঁশিখাল। একসময় এখানে জৈন সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস ছিল। প্রায় হাজার বছর আগে তাঁরা জায়গাটি ছেড়ে চলে যান বলে অনুমান। কিন্তু জৈনদের উপস্থিতির নীরব সাক্ষ্য আজও বহন করে চলেছে রাজপাড়ার এই সত্যনারায়ণের থান। ভগ্নমূর্তিটির মাথার পিছনে পঞ্চমুখী সাপ। বর্ষার সময় বাঁশিখালে জল বাড়লে থানের আশপাশে বালিমাটি ধুয়ে নীচ থেকে সরা ঢাকা কলস বের হয়ে পড়ে। কোনওটির ভিতরে হাড়গোড়, কোনওটিতে তামার মুদ্রা ও চামচ পেয়েছেন গবেষকরা। তাঁদের অনুসন্ধানে জানা যাচ্ছে, সুদূর অতীতে এই স্থানে জৈন দেউল ছিল। দেউলের পাশে ছিল শ্মশানভূমি। জৈনদের পারলৌকিক ক্রিয়ার অংশ ওই নিবেদন শিলা, কলসিতে থাকা দেহাবশেষ, মুদ্রা, চামচ ও অন্য সামগ্ৰী। গ্ৰামবাসীদের কাছে অবশ্য সেসব আজও রহস্যময়! স্থানীয় বাসিন্দা মুকুন্দরাম চক্রবর্তী বলেন, এখানে মাকড়া পাথরের একাধিক স্তম্ভ ও একটি ভগ্ন মূর্তি পড়ে রয়েছে। স্থানীয় মানুষজন মূর্তিটিকে সত্যনারায়ণ রূপে পুজো করেন। জায়গাটি ‘গ্রামথান’ নামে পরিচিত। তবে ওখানে মাটির নীচে এমন ধরনের কলস থাকার কারণ আমাদের কাছেও স্পষ্ট নয়। গবেষক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সুশীলকুমার বর্মন বলেন, পড়িহাটী, বিনপুরের নদী তীরবর্তী এলাকায় জৈন সম্প্রদায়ের মানুষজন বসবাস করতেন। রাজপাড়া এলাকায় যে জৈন মন্দির বা দেউল ছিল, সেবিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।