


ডাঃ নবনীতা মহাকাল, ডাঃ আব্দুর রহমান: প্রবাদে আছে, ‘বুদ্ধি যার বল তার’, শরীর দিব্যি রয়েছে অথচ ভুলো মন। কোথায় কী রাখছেন কিছুই মনে থাকছে না। বেশিরভাগই মানুষ সমস্যাটাকে সেভাবে পাত্তা দেন না। কিন্তু এ থেকেই পরে শুরু হয় অ্যালঝাইমার্স, ডিমেনশিয়ার মতো স্মৃতি ধূসর হওয়ার নানা অসুখ। তাই যত্ন নিতে হবে গোড়া থেকে। মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য যদি ভালো না হয় তবে মানুষের দেহের সমস্ত অঙ্গগুলির কার্যকারিতাও প্রভাবিত হয়।
এখন মানুষ দৈনন্দিন খাবারের ব্যাপারে অনেক বেশি সচেতন। খাদ্য তালিকায় নতুন নতুন যোগ হচ্ছে নানা ধরনের খাবার ও ভেষজ। কোন খাবার বা ভেষজ হার্টের জন্য ভালো আবার ত্বকের জন্য কোনটা ভালো। ঠিক একইভাবে আপনার মস্তিষ্কের জন্যও রয়েছে কিছু বিশেষ খাবার ও ভেষজ। যেগুলো মস্তিষ্ককে শুধু পুষ্টি প্রদান করে না, অন্যান্য প্রয়োজনীয় যৌগও সরবরাহ করে, যা মস্তিষ্কের কোষ গঠনে সাহায্য করে। এর পাশাপাশি মনকে ভালো রাখার কাজটিও করে থাকে।
বুদ্ধি বাড়াতে বা ব্রেন সতেজ রাখতে মানসিক স্বাস্থ্যকে উন্নত রাখতে হবে। কারণ বুদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্য কিংবা মানসিক সুস্থতার উন্নতি অনেকাংশে নির্ভর করে ইন্দ্রিয়গুলোর অনুভূতি ও কাজের উপর। ইন্দ্রিয়গুলোর বিভিন্ন কাজ উন্নত স্মৃতিশক্তি ও সতেজ ব্রেন তৈরিতে সাহায্য করে।
কী বলছে আধুনিক বিজ্ঞান ও আয়ুর্বেদ?
আমাদের স্মৃতিশক্তি তিনটি ‘আর’-এর ভিত্তিতে কাজ করে। যেমন— রিসেপশন, রেজিস্ট্রেশন এবং রিকল। প্রথমত, আমরা যখন কোনও তথ্য গ্রহণ করছি, তখন সেটা হতে হবে খুবই স্পষ্ট। কারণ সেই তথ্য মস্তিষ্কে নথিবদ্ধ হয়ে যায়। আর একবার ভালোভাবে তা মাথায় ঢুকে গেলে, পরে মনে করাটা খুব কঠিন হয় না। এই বিষয়গুলো যদি ধাপে ধাপে না ঘটতে থাকে, তাহলে আমরা স্মৃতি হারিয়ে ফেলব এবং প্রয়োজনে তা মনে করতে পারব না। ঠিক সময় ঠিক জিনিস মনে করাই হল ভালো বুদ্ধি, মেধা বা স্মৃতিশক্তির নমুনা। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুসারেও ‘মেধা’ আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের তিনটি দিক নিয়ে কাজ করে— বুদ্ধিমত্তা (ধী), ধারণ (ধৃতি) এবং স্মরণ (স্মৃতি)।
বুদ্ধি, স্মৃতিশক্তি হ্রাস বা মেধার সমস্যার কারণ হিসাবে আয়ুর্বেদে বলা হয়, শরীরে পৃথিবী মহাভূত এবং কফ দোষের অসামঞ্জস্যতার কারণে বুদ্ধি, স্মৃতিশক্তির হ্রাস বা মেধার সমস্যা দেখা দিতে পারে। এছাড়াও ক্ষীণ স্মৃতিশক্তি এবং বুদ্ধির জন্য অনেক কিছুই দায়ী থাকতে পারে। তবে এই সমস্যার জন্য প্রাথমিকভাবে অপুষ্টিকর আহারই দায়ী। অনেক সময় মস্তিষ্কে রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতার কারণেও ক্ষীণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী হতে পারেন যে কেউ। তবে মস্তিষ্কে রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে কোনও শারীরিক অসুস্থতা বা বিভিন্ন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে।
বুদ্ধি, স্মৃতিশক্তি এবং মেধা (সতেজ ব্রেন) বাড়াতে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে কিছু সাধারণ পরামর্শ দেওয়া হয়েছে তা হল—
বায়ু, অগ্নি, জল এবং পৃথিবী মহাভূত এ সবই স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। তাই বুদ্ধি ও তার তীক্ষ্ণতা বাড়াতে এগুলোর কোনও বিকল্প নেই।
খাদ্যাভ্যাস: যদিও আর্য়ুবেদ চিকিৎসাশাস্ত্র বিশেষ ধরনের খাদ্যাভ্যাসের কথা বলে তবুও মৌলিক কিছু বিষয় না মানলেই নয়। যেমন:
১) টাটকা এবং সবুজ শাকসব্জি, গাজর, ফল, বাদাম, ঘি ইত্যাদি খাবার খেলে স্মৃতিশক্তি এবং বুদ্ধি বাড়ে।
২) যতটা সম্ভব বেশি চর্বিযুক্ত মাংস, রিফাইন তেল এবং তেল-মশলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
৩) মেধা বাড়াতে মধুর রস যুক্ত খাবার বেশি খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আয়ুর্বেদ শাস্ত্র। তবে মধুর রস যুক্ত খাবারের মধ্যে ঘি এবং মধু গ্রহণকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
জীবনযাপন: জীবনযাপনের মাঝে কিছু ছোটখাট পরির্বতন স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন:
১) দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় শারীরিক কাজকর্মের পরিমাণ বাড়িয়ে দিন। এতে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
২) যেসব শিশু প্রতিদিন ৩০ মিনিট বা তার বেশি খেলাধুলা করে তাদের মেধা সাধারণ শিশুদের তুলনায় দ্রুত বাড়ে।
৩) যোগব্যায়াম স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সহায়তা করে।
এবার দেখে নেওয়া যাক আয়ুর্বেদে বুদ্ধি বাড়াতে বা ব্রেন সতেজ রাখতে কী করার কথা বলে?
আয়ুর্বেদ গ্রন্থ চরক সংহিতায় মেধা নিয়ে বহুলচর্চিত অধ্যায়ের অংশ হল, মেধ্য রসায়ন। এটি আয়ুর্বেদিক ন্যুট্রপিক ভেষজ বা ওষুধের একটি গ্রুপ, যা জ্ঞানশক্তি ও স্মৃতিশক্তি উন্নত করে। মেধ্য রসায়ন হল আয়ুর্বেদিক সম্পূরক, যা অধিগ্রহণ, ধারণ এবং স্মরণশক্তি উন্নত করে। এটি জ্ঞান, স্মৃতি, বুদ্ধিমত্তা, সৃজনশীলতা, শেখার দক্ষতা এবং কর্মক্ষমতাকে উন্নত করে। উপরন্তু, এই সম্পূরকগুলি অনাক্রম্যতা শক্তি বাড়ায় এবং ইমিউন সিস্টেমের কার্যকারিতা উন্নত করে। মানব মস্তিষ্কে এই প্রভাবগুলি প্রয়োগ করার জন্য ভেষজের যে অন্তর্নিহিত বিশিষ্ট গুণ আছে তা আধুনিক বিজ্ঞানের মাপকাঠি উত্তীর্ণ হয়েছে, যা ন্যুট্রপিক গুণ হিসাবেও পরিচিত।
চরক সংহিতায় মেধ্য রসায়ন হিসাবে চারটি প্রধান ভেষজ—
এই চারটি ভেষজ উদ্ভিদের মধ্যে শঙ্খপুষ্পীকে আচার্য চরক ‘সর্বোত্তমমেধাবর্ধক’ ভেষজ হিসাবে বিবেচিত করেছেন।
আচার্য চরকের মত অনুসারে মেধ্য রসায়নের মাত্রা—
মেধ্য রসায়ন ভেষজ গ্রহণ করার সেরা সময়: ন্যুট্রপিক ভেষজগুলি সকালে এবং সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের পরে বা রাতের খাবারের ২-৩ ঘণ্টা আগে খালি পেটে খাওয়া যেতে পারে।
অন্যান্য ভেষজ মেধ্য (ন্যুট্রপিক ভেষজ)—
মহর্ষি সুশ্রুত তাঁর সুশ্রুত সংহিতা গ্রন্থে নিম্নলিখিত ভেষজগুলিকে মেধ্য (ন্যুট্রপিক ভেষজ) বলেছেন:
ব্রাহ্মীশাক (ওয়াটারহিসপ) -বাকোপা মোন্নয়ারি
জ্যোতিস্মতি (মালকাঙ্গানি) -সেলাস্ট্রাস প্যানিকুলাটাস
কুশমাণ্ড (চালকুমড়ো) -বেনিনকাসা হিসপিডা
বচা (বচ) -অ্যাকোরাস ক্যালামাস
জটামাংসী (স্পাইকনার্ড)-নারডোস্তাকিস জটামাংসী
চিত্রক (চিতা গাছ) - প্লাম্বাগো জাইলানিকা
এই ভেষজগুলি ছাড়াও, স্বর্ণ ভস্ম এবং মুক্তাপিষ্টির মতো কিছু মূল্যবান ওষুধও আয়ুর্বেদে মেধ্য রসায়ন হিসাবে বিবেচিত। উন্নত মেধার জন্য শিশুদের স্বর্ণপ্রাশনরূপে খাওয়ানো হয়।
তাছাড়া গোরুর দুধের ঘি-কেও মেধ্য বলা হয়ে থাকে, অর্থাৎ এতে স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধিমত্তা বাড়ে এবং একেই প্রাথমিক উপাদান হিসেবে মনে করা হয়। ঘি সাধারণত ভারতের প্রত্যেক বাড়ির রান্নাঘরেই ব্যবহার হয় এবং তরকারি, ডাল, রুটি, খিচুড়ি আমরা যা কিছুই খাই, তাতেই দেওয়া যায়।
মেধ্য রাসায়নের উপকারিতা—
প্রাচীনকালে মেধ্য রসায়ন— বৌদ্ধিক ক্ষমতা, বুদ্ধিমত্তা, স্মৃতিশক্তি এবং জ্ঞান বিষয়ক কর্মক্ষমতা উন্নত করতে ব্যবহৃত হতো। আজকাল ব্যস্ত জীবনের কারণে এর ব্যবহার আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। এটি মানসিক চাপ কমায়, মনকে শান্ত করে, যুক্তিযুক্ত চিন্তাভাবনা ও দক্ষতাকে উন্নত করে। উপরন্তু, এটি স্মৃতিশক্তি বা মেধা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে এবং ধারণ ক্ষমতাকে উন্নত করে ভুলে যাওয়া কমাতে সাহায্য করে।
চরক সংহিতা অনুসারে মেধ্য রসায়নের নিম্নলিখিত উপকারিতা রয়েছে:
এটি আয়ুষ্কাল বর্ধক, জঠরাগ্নিকে প্রদীপ্ত করে, হজম শক্তি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, ত্বকের সাধারণ উজ্জ্বলতা, গলার স্বরের মান উন্নত করে, মস্তিষ্কের শক্তি সতেজ করে।
সাধারণত মেধ্য রসায়ন নিম্নলিখিত মানসিক ক্ষমতা এবং চরিত্রগুলির উন্নতি করে:—
স্মৃতি বা মেধার ধারণ বুদ্ধিমত্তা একাগ্রতা মানসিক উপলব্ধি সৃজনশীলতা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দীর্ঘায়ু শেখার এবং যুক্তির দক্ষতা।
আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী মেধ্য রসায়নে উল্লেখিত সহজলভ্য ঔষধি গাছ-গাছড়ার পরিচয় ও ব্যবহার সম্বন্ধে জানা যাক:
থানকুনিপাতা : গ্রামে-গঞ্জে গত কয়েক বছর আগেও এই পাতার খুব কদর ছিল। কিন্তু যত দিন গিয়েছে মানুষ ভুলতে বসেছে এই পাতার উপকারিতা। এমনকী অনেকে চেনেও না। কারও হাত কিংবা পা কেটে গেলে বা পেটের কোনও সমস্যা হলেই খোঁজ পড়ত থানকুনি পাতার। প্রাচীন আর্য়ুবেদ শাস্ত্রেও এই পাতার বহু গুণাগুণ বর্ণিত রয়েছে। অনেক ওষুধও তৈরি হয় এই পাতার রস থেকে। শরীরকে নানা দিক থেকে সুস্থ রাখতে এই পাতার জুড়ি মেলা ভার। প্রতিদিন এই পাতার রস খেতে পারলে উপকার ছাড়া অপকার হয় না। খ্রিস্টপূর্ব ১৭ শতক থেকেই আফ্রিকা, জাভা, সুমাত্রাতেও ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হতো এই পাতা। এই পাতা ব্যাঙের মাথার মতো দেখতে বলে একে মণ্ডুকপর্ণী বলে। বৈজ্ঞানিক নাম সেনটেলা এশিয়াটিকা এবং অ্যাম্বেলিফেরি গোত্রভুক্ত উদ্ভিদ। থানকুনি পাতার রস বা পাতা বাটা আমাশা বা অ্যামিবায়েসিস রোগে ব্যবহার করা হয়। থানকুনি পাতা এবং ডাঁটার রস মেধা বাড়াতেও সাহায্য করে। মস্তিষ্ক এবং স্নায়ুতন্ত্রের উপর এই শাকের কার্যকারিতা আছে বলে একে বিভিন্ন মানসিক রোগের চিকিৎসায় আয়ুর্বেদিক নানা ওষুধের উপাদান হিসেবে ব্যবহার হয়। দেখে নিন (Gotu Kola) থানকুনি পাতার উপকারিতা।
মানসিক অবসাদ কমায়: যাঁরা মানসিক সমস্যায় ভুগছেন তাঁদের জন্য খুব ভালো থানকুনি পাতার রস। থানকুনি স্ট্রেস হরমোনের ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে মানসিক চাপ আর অস্থিরতা দুই কমে। এর ফলে অ্যাংজাইটির আশঙ্কাও কমে যায়।
মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ে : নিয়মিত থানকুনি পাতা খাওয়া শুরু করলে শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং পেন্টাসাক্লিক ট্রিটারপেনস নামের একটি উপাদানের মাত্রা বাড়তে শুরু করে। যার ফলে ব্রেনসেল ভালোভাবে কাজ করতে পারে। ফলে স্মৃতিশক্তির উন্নতি তো ঘটেই, সেই সঙ্গে বুদ্ধির ধারও বাড়ে চোখে। এই কারণেই ছোট বাচ্চাদের থানকুনি পাতার রস (Centella Asiatica) খাওয়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। এমনকী অ্যালঝাইমার্সের ওষুধও তৈরি হয় এই পাতার রস থেকে।
ঘুমের সমস্যা: ঘুম হয় না? রাতের পর রাত জেগে কাটান? তাহলে প্রতিদিন সকালে উঠে আয়ুর্বেদ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে থানকুনি পাতা ভেজানো জল খান। স্নায়ু শিথিল হবে। ঘুম আসবেই।
ব্রাহ্মী : স্যাঁতসেঁতে জলা জায়গায় জন্মায় এই শাক। ছোট পুরু পাতাযুক্ত লতানে গাছ। কলপাড়ে বা জলের ধারে এই শাকের দেখা মেলে সহজেই। ব্রাহ্মীর বৈজ্ঞানিক নাম বাকোপা মোন্নয়ারি এবং এটি স্কোফুলেরিয়েসি গোত্রভুক্ত উদ্ভিদ। যা হার্ব অফ গ্রেস নামেও পরিচিত, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্ভিদ। ব্রাহ্মী সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ হল স্মৃতিশক্তি বর্ধক। এই শাক কাঁচা অবস্থায় ভালো করে ধুয়ে পাতা ও ডাঁটা ভালো করে রস করে সকালে খালিপেটে খাওয়া যেতে পারে। ব্রাহ্মী স্মরণশক্তি যেমন বাড়াতে সাহায্য করে তেমনি মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর অতিসক্রিয় অবস্থাকে প্রশমিত করতে সাহায্য করে। এইজন্য এটি উন্মাদ রোগে এবং অপস্মার বা খিঁচুনি (সিজার ডিসঅর্ডার) রোগের চিকিৎসায় আয়ুর্বেদিক ঔষধ হিসাবে ব্যবহার করা হয়।
মহর্ষি সুশ্রুত ব্রাহ্মীকে মেধ্য রসায়ন বলে অভিহিত করেছেন, যা সব ধরনের মানসিক সমস্যার সমাধানে ব্যবহৃত হয়। তিনি এর আরও কিছু ঔষধি গুণাগুণ ব্যাখ্যা করেছেন, যেগুলি হল —
স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে : সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ব্রাহ্মী একাগ্রতার ক্ষমতাও বাড়িয়ে দেয়। এটি মস্তিষ্কের জ্ঞানগর্ভ ক্রিয়াকলাপের বিকাশ ঘটায় এবং মেধা বাড়াতে সাহায্য করে ।
অ্যালজাইমার্স : কিছু কিছু নিউরোলজিক্যাল সমস্যা যেমন পারকিনসনস এবং অ্যালজাইমার্স কোনও মানুষের স্মৃতিশক্তি হ্রাসের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত। ব্রাহ্মীর যেহেতু স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করার গুণাগুণ রয়েছে, তাই এটি মস্তিষ্কের কোষের পুনর্জন্ম ঘটাতে সাহায্য করে এবং এটি অ্যালজাইমার্স রোগের মতো ডিজেনারেটিভ নিউরোলজিক্যাল সমস্যা নিরাময়েও সহায়ক।
মানসিক চাপ এবং উদ্বেগ হ্রাস করে: আমাদের জীবনে বর্তমানে যখন এত কিছু ঘটে চলেছে, বিশেষ করে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এত অনিশ্চয়তা চারদিকে, তখন উদ্বেগ, ভয়, মানসিক চাপের অনুভব প্রভৃতি হওয়া খুবই সাধারণ। এই সব কিছু কেবলমাত্র কারও মানসিক স্বাস্থ্যেরই অবক্ষয় ঘটায় না, বরং এতে তার শারীরিক স্বাস্থ্যও বিঘ্নিত হয়। ব্রাহ্মী এমনই একটি ঔষধি উদ্ভিদ, যা মানসিক চাপ এবং উদ্বেগ প্রশমনে সাহায্য করে, আর শরীরে কর্টিসল তথা স্ট্রেস হরমোনের ক্ষরণকে নিয়ন্ত্রণ করে।
অনিদ্রা বা স্লিপ ডিসঅর্ডার : মস্তিষ্কে যখন এত কিছু ঘটে চলেছে, তখন শান্তির প্রগাঢ় নিদ্রা হওয়া খুবই কঠিন হতে পারে। এমনকী অত্যন্ত ক্লান্তিকর একটা দিন কাটানোর পরেও। ব্রাহ্মী সেবনে ভালো ঘুম হয়, কারণ এটি মনকে শান্ত এবং চিন্তামুক্ত রাখে ।
ডায়াবিটিস : সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে ব্রাহ্মী অ্যান্টি-ডায়াবিটিক ওষুধ হিসাবেও ব্যবহার হতে পারে। ব্রাহ্মী রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, ফলে ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে ।
অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট : ব্রাহ্মীতে অ্যান্টি-অক্সিডেটিভ গুণাগুণ রয়েছে, যা শরীরে ফ্রি র্যাডিক্যালসের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা দেয়। ফ্রি র্যাডিক্যালস কোষের ক্ষতি করে। এর ফলে শরীরের যে ক্ষতি হয়, তার জেরে হার্টের রোগ এবং ক্যান্সারের মতো বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা হতে পারে। সুতরাং, ব্রাহ্মীশাক এইক্ষেত্রে শক্তিশালী ঔষধিরূপে প্রয়োগ করা যায়।
অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার (ADHD): আমরা যেমন জানি, ব্রাহ্মী নানা ধরনের নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডারের উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে অতি সক্রিয়। তেমনভাবেই এটি শিশুদের ADHD-র উপসর্গ প্রশমন করতেও অত্যন্ত কার্যকরী।
শঙ্খপুষ্পী: এই গাছটির ফুল শঙ্খের মতো সাদা এবং দেখতে বলে একে শঙ্খপুষ্পী বলে। এটি আসলে অপরাজিতারই ভেদ। গাছটি সাধারণত পাথুরে মাটিতে হয়। বৈজ্ঞানিক নাম কনভলভুলাস প্লুরিকাওলিস এবং কনভলভুলেসি গোত্রভুক্ত উদ্ভিদ। এর পঞ্চাঙ্গ অর্থাৎ গাছটির সমস্ত কিছুই আয়ুর্বেদিক ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটি মস্তিষ্ক স্নায়ুর উত্তেজনাকে প্রশমিত করতে সাহায্য করে। শঙ্খপুষ্পী ভালো নিদ্রাজনক অর্থাৎ ঘুমের সহায়ক। বিভিন্ন মানসিক রোগের চিকিৎসাতেও আয়ুর্বেদিক ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয় এই গাছটিকে। উদ্ভিদটির কল্ক বা কাঁচাবাটা সাধারণত ব্যবহার হয়ে থাকে মেধ্য রসায়ন হিসাবে।
আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী
শঙ্খপুষ্পী তিক্তরস (তিক্ত স্বাদ), স্নিগ্ধ (তৈলাক্ত, চটচটে) এবং লঘু (হালকা) গুণ, শীত বীর্য (ঠান্ডাধর্মী) এবং মধুর বিপাক জাতীয় ভেষজ। এটি ত্রিদোষনাশক, অর্থাৎ পিত্ত, বায়ু এবং কফদোষ শান্ত করে এবং প্রধানত বাত ও পিত্তদোষের উপর কাজ করে।
এটি মেধ্য (স্মৃতি বৃদ্ধিকারী), দীপন (পাচকাগ্নি বাড়ায়), পাচন (হজমে সাহায্য করে), রোচন (ক্ষুধা জাগায়), কুষ্ঠহর (চর্মরোগ নাশ করে), শোথহর (প্রদাহ কমায়), এই আশ্চর্য ভেষজটি অসংখ্য স্বাস্থ্য সমস্যার একটি শক্তিশালী সমাধান।
এটি সংস্কৃতে মঙ্গল্যাকুশুমা নামে পরিচিত। যার অর্থ সৌভাগ্য এবং সুস্বাস্থ্যের আনয়নকারী। এই নীল-সাদা ফুলের গাছের প্রতিটি অংশ বিভিন্ন রোগের চিকিত্সা এবং দীর্ঘায়ু বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত উপকারী।
বিদ্যমান রাসায়নিক উপাদান
সামগ্রিকভাবে এই বহুল প্রচলিত ভেষজে- শঙ্খপুশপাইন, কনভলভুলিন, কনভোলিডিন, কনভলভাইন, কনভোলাইন, কনভোলিন, কনফোলাইনের মতো অ্যালকালয়েড সহ অসংখ্য সক্রিয় উপাদান রয়েছে। এগুলি ছাড়াও এতে রয়েছে উদ্বায়ী তেল, ফ্যাটি অ্যাসিড, ফ্যাটি অ্যালকোহল, হাইড্রোকার্বন, পালমেটিক অ্যাসিড, লিনোলিক অ্যাসিড, মিরিস্টিক অ্যাসিড, ফ্ল্যাভোনয়েড, স্টেরয়েড-ইটোস্টেরল, ডি-গ্লুকোজ, মাল্টোজ, স্টার্চ, কার্বোহাইড্রেটএবং অ্যামিনো অ্যাসিড।
শঙ্খপুষ্পীর স্বাস্থ্য উপকারিতা
জ্ঞানীয় কার্যকারিতা উন্নত করে: শঙ্খপুষ্পী মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধির একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিকার। এতে উপস্থিত শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ফ্ল্যাভোনয়েড একজন ব্যক্তির স্মৃতিশক্তি, মেধা, একাগ্রতা , প্রশান্তি, দক্ষতাকে উন্নত করে। মস্তিষ্কের টনিক এবং উদ্দীপক হওয়ার কারণে, শঙ্খপুষ্পী গ্রহণকারী ব্যক্তির স্মৃতিশক্তি, যুক্তি, সমস্যা সমাধান এবং অন্যান্য জ্ঞানীয় ক্ষমতার উন্নতি হয়। উদ্ভিদের নিউরো প্রোটেক্টিভ উপাদান স্মৃতিশক্তি হ্রাস রোধ করে এবং মস্তিষ্কের উত্তেজনা দূর করে।
মানসিক অবসাদ কমায় ও বিষণ্ণতা সমাধানে শঙ্খপুষ্পী: শঙ্খপুষ্পী তার শক্তিশালী অ্যান্টি-স্ট্রেস, অ্যান্টি-ডিপ্রেসিভ এবং অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি বৈশিষ্ট্যগুলির কারণে উচ্চ তাত্পর্য বহন করে যা বিষণ্ণতা, ডিমেনশিয়া, অস্থিরতা ইত্যাদির মতো বিভিন্ন ধরনের মানসিক অবসাদ গঠিত সমস্যাগুলির চিকিত্সার জন্য অত্যন্ত কার্যকরী। ডোপামিনের ফলস্বরূপ সেরোটোনিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং উদ্বেগের বিভিন্ন উপসর্গ কমাতেও সাহায্য করে— যার মধ্যে রয়েছে অস্থিরতা, অস্বস্তি, ঠান্ডা হাত ও পা এবং মন ও শরীরকে শিথিল করতেও সাহায্য করে।
হৃদয়ের জন্য ভালো বা কার্ডিয়ো-প্রোটেক্টিভ: শঙ্খপুষ্পী শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেটিভ প্রকৃতির কারণে বিভিন্ন হৃদরোগের চিকিৎসায় অত্যন্ত কার্যকরী। এটি হৃৎপিণ্ডের পেশিকে শক্তিশালী করে এবং রক্তনালীতে লিপিড জমা হওয়া প্রতিরোধ করে। ইথানোলিক নির্যাসের মতো বায়োঅ্যাকটিভ উপাদানগুলি নন—এস্টারিফাইড ফ্যাটি অ্যাসিডের মাত্রা কমায়। যেমন NEFA। তাই হার্ট অ্যাটাক, হার্ট ব্লক, রক্ত জমাট ইত্যাদির ঝুঁকি কমায়। এছাড়াও এটি কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
হজমশক্তিকে উদ্দীপিত করে : ভেষজটির পাচক বৈশিষ্ট্য হজমের উন্নতিতে অত্যন্ত উপকারী বলে প্রমাণিত হয়েছে। এটি পাচন রসের নিঃসরণকে উদ্দীপিত করে বলে প্রয়োজনীয় পুষ্টির শোষণ বৃদ্ধি পায় এবং হজমশক্তি বাড়ায়। পেটে ব্যথা, পেটের আকুঞ্চন ও প্রসারণ, আলসারেটিভ কোলাইটিস এবং গ্রহণী রোগের চিকিত্সায় ব্যবহৃত হয় ।
মাথাব্যথা প্রতিরোধ করে : শঙ্খপুষ্পী দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা, উত্তেজনা ইত্যাদি থেকে উপশম করে। অতিরিক্ত কাজের চাপ, মানসিক উদ্বেগ ইত্যাদি নানা কারণে মাথাব্যথা হয়। এতে বিরক্তিকর স্নায়ু প্রশমিত হয়, মস্তিষ্ককে শান্ত করে এবং স্নায়ুর কার্যকারিতা উন্নত করে। শঙ্খপুষ্পী তেলে কপাল মালিশ করলে মাথাব্যথার উপশম হয়।
উচ্চ রক্তচাপের জন্য শঙ্খপুষ্পী : শঙ্খপুষ্পীতে সক্রিয় উপাদানগুলি উচ্চ রক্তচাপ বা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তিদের উপযুক্ত প্রতিকার গড়ে তোলে। এটি ধমনীকে শক্ত হতে বাধা দেয় বা এথেরোস্ক্লেরোসিস হতে দেয় না। ফলে হার্টস্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কা কমায় এবং হৃদরোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। শঙ্খপুষ্পী উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় একটি আশ্চর্যজনক প্রাকৃতিক প্রতিকার হিসেবে কাজ করে।
স্নায়ু রোগের জন্য শঙ্খপুষ্পী : মেধা বা স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিকারী এই ভেষজ মৃগিরোগ, ডিমেনশিয়া, আলঝাইমার্স-এর মতো রোগের একটি দুর্দান্ত প্রতিকার। এটি নিউরোনের ধ্বংসকে প্রতিরোধ করে এবং জ্ঞানীয় কার্যকারিতাকে উন্নত করে।
আয়ুর্বেদ শাস্ত্র ‘কাশ্যপ সংহিতা’য় উল্লেখিত শিশুদের মেধাবর্ধক রূপে সর্বাধিক প্রচলিত পদ্ধতি সম্বন্ধে জানা যাক।
স্বর্ণপ্রাশন সংস্কার -এটি আসলে আয়ুর্বেদিক পদ্ধতিতে শিশুদের টিকাকরণ। এই বৈদিক টিকাকরণ কৌশলটি প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে, যা স্বর্ণভস্ম, ব্রাহ্মী, শঙ্খপুষ্পী, ত্রিকটূ, ঘি ও মধু সহযোগে তৈরি করা হয়। এই স্বর্ণপ্রাশন প্রতি মাসের পুষ্যা নক্ষত্রের একটি নির্দিষ্ট দিনে (প্রতি ২৭ দিন অন্তর), জন্মকাল থেকে ১৬ বছর বয়সি শিশুদের খাওয়ানো হয়। তাই এই দিনে স্বর্ণপ্রাশনের মাধ্যমে শিশুর সামগ্রিক স্বাস্থ্য, শারীরিক সুস্থতা, মানসিক সুস্থতা, গায়ের রং, বুদ্ধি, বল, রোগ প্রতিরোধ ও হজম ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। স্বর্ণপ্রাশন হল আয়ুর্বেদের একটি আশীর্বাদ। মাত্র এক মাস সেবনের মধ্যেই শিশু সব ধরনের রোগ সংক্রমণ থেকে রক্ষা পায়। কথিত আছে, মাত্র ৬ মাস ধরে স্বর্ণপ্রাশন খাওয়ানো হলে কোনও শিশুর মেধা ও বুদ্ধি এতটাই বাড়ে যে, সে কোনও কথা একবার কানে শুনলে খুব সহজেই মনে রাখতে পারে।
শিশুর স্বর্ণপ্রাশনের দরকার কখন ও কেন?
১. শিশু একটুতেই অসুস্থ হয়ে পড়লে, সারাবছর রোগ-ব্যাধিতে ভুগতে থাকলে।
২. শিশুর পড়াশোনার সময় মনোযোগের অভাব হলে।
৩. শিশু অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়লে।
৪. শিশুর বুদ্ধি কম হলে ও কোনও কিছু মনে রাখার ক্ষমতা খুব দুর্বল হয়ে পড়লে।
৫. শিশুর ইমিউনিটির অভাব থাকলে।
৬. শিশুর শারীরিক ক্ষমতা কম থাকলে।
স্বর্ণপ্রাশনের পর শিশুরা কী কী উপকার পাবে?
১. শিশুদের মেধা ও বুদ্ধির বিকাশ হবে।
২. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে।
৩. গায়ের রং উজ্জ্বল হবে।
৪. হজম ক্ষমতা বাড়বে।
৫. শারীরিক, মানসিক ও সামগ্রিক সুস্থতা লাভ করবে।
সবশেষে মনে রাখা প্রয়োজন, শুধুমাত্র কোনও একটি নির্ধারিত ভেষজ উপাদান বা ওষুধ স্মৃতিশক্তি অথবা বুদ্ধি বাড়াতে পারে না। সঙ্গে সুষম খাদ্য, সঠিক জীবনশৈলী, ব্যায়াম ইত্যাদির সমন্বয়েই স্মৃতিশক্তি অথবা বুদ্ধি বাড়িয়ে ব্রেন সতেজ রাখা সম্ভব।
ডাঃ মহাকাল- ডেপুটি মেডিক্যাল সুপার ও চিকিৎসক, আলিগড় আয়ুর্বেদিক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, আলিগড়, উত্তরপ্রদেশ।
ডাঃ রহমান- সহ-অধ্যাপক ও চিকিৎসক, আলিগড় আয়ুর্বেদিক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, আলিগড়, উত্তরপ্রদেশ।