


নিজস্ব প্রতিনিধি, আসানসোল: আচমকা মাথার উপর গদার আছাড়! বিস্ময়ের ঘোর কাটার আগেই সামনে হাজির যমরাজ! মাথায় মুকুট। ইয়া বড় গোঁফ। চ্যালাটিও বেশ সুসজ্জিত। বগলে গোঁজা মস্ত একটা খাতা। সেটা আসলে ন্যায়-অন্যায়ের কিতাব। কিন্তু, কেন মাথায় গদার আঘাত? যমরাজের প্রশ্নে চ্যালা চিত্রগুপ্ত ত্রস্তভাবে কিতাব ঘাঁটতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর গম্ভীর মুখে জবাব—‘প্রভু, ব্যক্তিটি মর্ত্যলোকের কোনও নিয়মকানুনের ধার ধারছেন না। পথের দাবি পালনেও বড্ড অনীহা। বাইক চালাচ্ছেন, মাথা-রক্ষার বর্ম নেই। মর্ত্যের নিয়ম অনুযায়ী এ জিনিস মানা যায় না। ঘোরতর অন্যায়। দয়াকরে শাস্তির বিধান দিন।’ যমরাজ গদার আস্ফালন দেখিয়ে যমরাজ বললেন—‘ঠিক ঠিক ঠিক। এই অন্যায়কে একেবারে প্রশ্রয় নয়। তবে, বেচারাকে একটা সুযোগ দাও চিত্রগুপ্ত। সতর্ক করে দাও। এরপর মাথায় বর্ম না পরে পথে বেরোলেই সোজা আমার দুয়ারে পাঠিয়ে দিও। এটাই আমার বিধান।’ বৃহস্পতিবার আসানসোলের চিত্রামোড় দেখল জীবন্ত মানুষের ভিড়ে যমরাজ ও চিত্রগুপ্তকে। সৌজন্যে আসানসোল পুলিস। লক্ষ্য, পথ নিরাপত্তা বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি।
গত বছর পশ্চিম বর্ধমান জেলাতেই পথ দুর্ঘটনায় ২৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের একটা বড় অংশ বাইক আরোহী। পুলিসের দাবি, সিংহভাগ বাইক চালকদেরই মাথায় হেলমেট ছিল না। সেই কারণে হেলমেট পরার ব্যাপারে সচেতনতা বাড়ানোর উপর জোর দিয়েই চলেছে পুলিস। ফাইনও করা হচ্ছে। তাতেও কাজের কাজ হচ্ছে না। এবার স্বর্গলোক থেকে স্বয়ং ‘যমরাজ’কে এনে পথে নামিয়ে বাইক চালকদের বিবেকে ধাক্কা দিতে চাইছে আসানসোল দুর্গাপুর পুলিস কমিশনারেটের ট্রাফিক বিভাগ। এদিন, হীরাপুর ট্রাফিক গার্ডের উদ্যোগে চিত্রামোড়ে ওই সচেতনামূলক কর্মসূচি হয়। সেখানে পথনাটিকার আয়োজন করা হয়। নাটকের দৃশ্যে দেখা যায়, মদ্যপ অবস্থায় বাইক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন দু’জন। পরিবারের লোক হাউ হাউ করে কাঁদছেন। যমদূত এসে তাঁদের তুলে নিয়ে যাচ্ছেন। চিত্রগুপ্ত খাতা খুলে শোকাতুর পরিবারকে বলছেন—মাথায় হেলমেট না পরাতেই মৃত্যু। তাই হেলমেট না পরাটা অপরাধ।
এদিন, অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন ডিসি (ট্রাফিক) সতীশ পশুমূর্তি। সিভিক ভলান্টিয়ার অচিন্ত্য রক্ষিত সেজেছিলেন যমরাজ। চিত্রগুপ্ত হয়েছিলেন সিভিক ভলান্টিয়ার অমিত পাসা। অনুষ্ঠান শেষে ‘যমরাজ’ ও ‘চিত্রগুপ্ত’কে রাস্তায় নামিয়ে দেন পুলিস কর্তারা। পুত্র সন্তানকে স্কুটির সামনে দাঁড় করিয়ে হেলমেট না পরেই যাচ্ছিলেন এক যুবক। স্কুটি থামিয়ে যুবকের মাথায় পড়ল ‘যমরাজ’-এর গদার বাড়ি। পাশে দাঁড়িয়ে শাস্তির ব্যাখ্যা দিলেন ‘চিত্রগুপ্ত’। স্ত্রীকে নিয়ে ইলেকট্রিক বাইকে দিব্যি যাচ্ছিলেন এক ব্যক্তি। মাথায় গোদার ঘা পড়তেই উত্তেজিত তিনি। বলেন, ‘ইলেকট্রিক স্কুলটি চালাতে আবার হেলমেট পরতে হয় না কি?’ ‘যমরাজ’ শান্ত ভাবে বললেন, বড় গাড়ি ধাক্কা মারলে এই ইলেকট্রিক স্কুটি কি আপনাকে রক্ষা করবে? তখন তো আমার দু’য়ারেই আসতে হবে। কথা শেষ হতে না হতেই দেখা মেলে নাবালক প্রেমিক যুগলকে। দু’জনেই ইউনিফর্ম পরিহিত। যাচ্ছিল ভগৎ সিং মোড়ের দিকে। বাইক থামালেন যমরাজ। বেশ রসিকতার ঢঙেই বললেন, ‘বয়স কত বাবা?’ ভয়ে জড়সড় নাবালকের জবাব, ১৭ বছর। সঙ্গেই সঙ্গেই কিতাব নিয়ে হাজির চিত্রগুপ্ত। মহারাজ, এই বাইক চালক একেই নাবালক। তার উপর মাথায় হেলমেট নেই। সঙ্গে কিশোরীও। এতো গুরুতর অপরাধ।
ডিসি (ট্রাফিক) সতীশ পশুমূর্তি বলেন, ‘বাইক চালকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতেই আমাদের এই উদ্যোগ।’ কিন্তু আসানসোলবাসী যমদূতের ভয়ে কতখানি সচেতন হবে, সেটাই এখন দেখার। • নিজস্ব চিত্র