


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: একটা খবর। নিমেষে যেন কেঁপে গেল পায়ের নীচের মাটি। চলকে ওঠে হরিমোহনের বুকের রক্ত। হু-হু করে পিছিয়ে যাওয়া দীর্ঘ ৪৫ বছর। ইডেনেও তো সেদিন এমনটাই হয়েছিল। ভাইয়ের নিথর দেহ শনাক্ত করার পরেই জ্ঞান হারান হরিমোহন। পিজি হাসপাতালের ম্যাকেঞ্জি ওয়ার্ড। বেড নম্বর এক্স এইট। ‘জানেন, মদনকে দেখার আগেই বুঝে গিয়েছিলাম সব শেষ।’ এত বছর পরেও কান্নায় বুজে আসে দাদা হরিমোহনের গলা।
১৯৮০’র ইডেন। বড় ম্যাচে পদপৃষ্ঠ হয়ে মারা যান ১৬ জন ফুটবলপ্রেমী। সবুজ ঘাসে রক্তের স্রোত। তিলোত্তমার ক্যানভাসে অভিশপ্ত ১৬ আগস্ট। গ্যালারিতে হুড়োহুড়ি। তারপর? বাংলার কোনও পাড়া চোখের পাতা এক করতে পারেনি। রান্না চড়েনি অনেক বাড়িতে। বুকফাটা আর্তনাদ। সারি সারি লাশের স্তুপে হারিয়ে গিয়েছিলেন তরতাজা মদন মোহন, ধনঞ্জয়, উত্তমরা। ফুটবলের মক্কা আজও বিলাপ করে, কেন এমন হল? বুধবারের পর গার্ডেন সিটির চিন্নাস্বামীও একইভাবে যন্ত্রণায় কাতর হবে যুগের পর যুগ। আইপিএলের ভিকট্রি প্যারেড মিলল মৃত্যুমিছিলে। পদপিস্ট হয়ে মারা গেলেন ১১ জন আরসিবি সমর্থক। বৃষ্টির জল আর মানুষের কান্নাধারা মিলেমিশে একাকার। চারু মার্কেটের বাড়িতে বসে হরিমোহন উদ্বিগ্ন। প্রশ্ন করেন, ‘কার দোষে এমন হল বলতে পারেন? আইপিএলের বিজয়ী নায়কদের দেখতে মাঠে গিয়েছিল ওরা। আমার ভাইটাও তো বড় ম্যাচে প্রিয় দলের জয় দেখতে চেয়েছিল। একটু সতর্ক হলে এমন মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী থাকতে হতো না।’ বিবর্ণ, হলদে হয়ে যাওয়া পুরনো সংবাদপত্র এখনও আগলে রেখেছেন হরিমোহন। তাতে একবার হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করেন, ‘এভাবে আর কত প্রাণ ঝরবে বলতে পারেন? আর যেন কোনও মায়ের বুক খালি না হয়।’ হরিমোহনের চোখের কোনে জল। হাহাকার আর বেদনার বালুচরে বেজে ওঠে মান্না দে’র সেই কালজয়ী গানের কলি, ‘খেলা ফুটবল খেলা... তোমরা আমার একটা কথাই রেখো। খেলার মাঠে কারও খোকা আর না হায়ায় দেখো।’
চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামের বাইরে পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারালেন ১১জন ক্রিকেটপ্রেমী। আহতের সংখ্যা বহু। শোকাচ্ছন্ন ক্রিকেট মহল। শোকজ্ঞাপন করলেন অনেকেই।
শচীন তেন্ডুলকর: বেঙ্গালুরুর বিজয়োৎসব ঘিরে যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল, তাতে আমি মর্মাহত। স্বজনহারাদের পরিবারের জন্য রইল সমবেদনা। ঈশ্বর যেন তাঁদের শক্তি দেয়।
দেবজিত্ সাইকিয়া (বিসিসিআই সচিব): খুবই দুঃখজনক ঘটনা। জনপ্রিয়তার নেতিবাচক দিক ফুটে উঠল। প্রিয় ক্রিকেটারদের দেখার জন্য ভক্তরা পাগলের মতো আচরণ করেন। আরসিবি’র আইপিএল জয়ের সেলিব্রেশন সুষ্টভাবে আয়োজন করা উচিত ছিল আয়োজকদের। মৃতদের পরিবারের প্রতি প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। তবে এই ঘটনার সঙ্গে বিসিসিআইয়ের কোনও সম্পর্ক নেই। তবুও এর থেকে শিক্ষা নিতে হবে।’
রাজীব শুক্লা (বোর্ড সহ-সভাপতি): মর্মান্তির ঘটনা। কী কারণে এমনটা ঘটল তা আমার পক্ষে বলা কঠিন। আমরা কাউকে দোষারোপ করতে চাই না। এটা রাজনীতি করার সময় নয়। কর্ণাটক ক্রিকেট সংস্থার থেকে রিপোর্ট পাওয়ার পরই কিছু মন্তব্য করতে পারব। তবে যেটা হয়েছে, খুবই বেদনাদায়ক। এই ধরনের ঘটনা থেকে আমাদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। মৃতদের পরিবার সমবদেনা জানাই।
আরসিবি: স্টেডিয়ামের বাইরের মর্মান্তিক ঘটনায় শোক প্রকাশের ভাষা নেই। আমরা অনেক পরে বিষয়টি জানতে পারি। স্টেডিয়ামের ভিতরে থেকে বাইরের কোনও খবরই রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। যখন বিষয়টি নজরে আসে, সঙ্গে সঙ্গে আমরা বিজয়োৎসব দ্রুত শেষ করার সিদ্ধান্ত নিই। সমর্থকরাই আরসিবি’র মূল শক্তি। কঠিন সময়ে তাঁদের পাশে থাকাটা আমাদের কর্তব্য।