গিরিশ ঘোষ তখন খুবই অসুস্থ। শয্যাশায়ী। সেই সময় একদিন বিনোদিনী দাসী তাঁর ‘আমার কথা’ লেখাটি গিরিশবাবুকে পড়তে দেন। বলেন, ‘আমার লেখায় যদি কিছু ভুল থাকে, আপনি সংশোধন করে দেবেন।’ সঙ্গে অনুরোধ করেন একটি ভূমিকাও লিখে দিতে। রাজি হন গিরিশবাবু। পড়তে পড়তে তিনি চমৎকৃত হন। লেখার কথনভঙ্গির মধ্যে যে সারল্য ছিল, সেটি তাঁর পছন্দ হয়েছিল। তবে গিরিশ ঘোষ বলেছিলেন, ‘সত্য অনেক সময় কটু ও অপ্রিয় হয়। সব সময় তা নিয়ে লেখা চলে না।’ এরপর তিনি একটি ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ভূমিকা বিনোদিনীর পছন্দ হয়নি। যে গুরুর সম্পর্কে কোনওদিন, কোথাও তিনি বিরুদ্ধ-কথা বলেননি, তাঁকে তিনি সেদিন বলেছিলেন, ‘আপনি আবার নতুন করে ভূমিকা অংশটি লিখে দিন।’ কেন? কেননা সেই লেখার মধ্যে ‘সত্য’ ছিল না। অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জের সামনে বিনোদিনী সেদিন তাঁর গুরুকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। বিনোদিনী লিখেছেন, ‘একটি ভূমিকা লিখিয়াও দিয়াছিলেন। লেখা অবশ্য খুব ভালো হইয়াছিল। কিন্তু তাহা আমার মনের মতন না হইবার কারণ, তাহাতে অনেক সত্য ঘটনার উল্লেখ ছিল না।’ সব দিক থেকেই বড় ও বিখ্যাত মানুষ গিরিশ ঘোষকে সেদিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর স্পর্ধা দেখানোর কথাই সম্ভবত বলতে চেয়েছিলেন নটী বিনোদিনী।
বইয়ের ভূমিকায় তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বিনোদিনী লিখলেন, ‘আমি ভাবিয়াছিলাম যে, আমার শিক্ষাগুরু, ও সমসাময়িক শ্রেষ্ঠ অভিনেতা যদি সকল ঘটনা ভূমিকায় উল্লেখ না করেন, তাহা হইলে আমার আত্মকাহিনী লেখা অসম্পূর্ণ হইবে।’ অথচ নিজের বঞ্চিত জীবনের জন্য বিনোদিনী কোনওদিন কারও দিকে আঙুল তোলেননি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ঈশ্বর এবং শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবাশ্রয়েই তিনি শান্তি পেয়েছিলেন। আমরা জানি না, কোন সত্যের কথা গিরিশবাবুকে লেখার কথা বলেছিলেন বিনোদিনী। গিরিশ ঘোষ চেষ্টা করেছিলেন আবার নতুন করে লিখতে ভূমিকা অংশটি লিখতে। বিনোদিনীকে তিনি রঙ্গচ্ছলে বলেছিলেন, ‘তোমার বইয়ের ভূমিকা না লিখে আমি মরব না।’ তা সত্ত্বেও আর ভূমিকা লেখা হয়নি। ১৯১২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি প্রয়াত হন গিরিশচন্দ্র ঘোষ। তাঁর আগের লেখাটিই বিনোদিনীর আত্মজীবনীর সঙ্গে যোগ করা হয়।