‘পঁচিশ বছর বয়সে প্রথম গোঙাইয়া চৈতন্য ভাগবত পড়তে শিখিলাম।’ বাকিটা ইতিহাস। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে গ্রাম-বাংলায় পরিবারের অন্দরে মহিলাদের জীবন আলেখ্য তুলে ধরেছিলেন তিনি। এক অবগুন্ঠিতা সাধারণ নারীর হাত ধরে লেখা হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী—‘আমার জীবন’। এই মহিয়সী মহিলার নাম রাসসুন্দরী দাসী। প্রথাগতগত শিক্ষার সুযোগ হয়নি। সকলের অগোচরে কারও সাহায্য ছাড়াই বাংলা অক্ষর শিখেছিলেন। ১৮০৯ সালে অধুনা বাংলাদেশের পাবনা জেলার পোতাদিয়া গ্রামের এক জমিদার পরিবারে জন্ম রাসসুন্দরী দাসীর। শৈশবেই বাবা পদ্মলোচন রায়কে হারান। বাড়ির বাইরে বালকদের জন্য পাঠশালা বসত। মা সেখানে বসিয়ে রাখতেন রাসসুন্দরীকে। শুনে শুনেই অক্ষরজ্ঞান। তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘তখন ছেলেরা ক খ চৌত্রিশ অক্ষর মাটিতে লিখিত। পরে একহাতে নড়ি লইয়া ঐ সকল লেখা উচ্চৈঃস্বরে পড়িত। আমি সকল সময়ই থাকতাম।আমি মনে মনে ঐ সকল পড়াই শিখলাম’। মাত্র ১২ বছরে বিয়ে হয় তাঁর। রাজবাড়ি জেলার ভর রামদিয়া গ্রামের জমিদার পরিবারে। স্বামী নীলমণি সরকার। তারপর ১২ সন্তানের জননী। একান্নবর্তী পরিবারের দায়িত্ব। নিত্যদিনের পরিশ্রমের পরও বই পড়ার প্রবল ইচ্ছা। কিন্তু অবকাশ কোথায়? সঙ্গে ভয়, পাছে কেউ দেখে ফেলে! তবুও হাল ছাড়েননি। শাড়ির আঁচলে লুকিয়ে রাখতেন চৈতন্য ভাগবত পুঁথি। ছেলের তালপাতায় লেখা অ আ ক খ মিলিয়ে শৈশবের অক্ষর জ্ঞান স্মরণ করে শেষপর্যন্ত কোনওক্রমে ওই পুঁথি পড়তে পারলেন। তারপর আরও বেশ কিছু পুঁথি। বাইরে থাকা ছেলের ইচ্ছেয় লেখাও শিখলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর লিখতে শুরু করলেন আত্মজীবনী। সেখানে পিঞ্জর-মুক্ত পাখির মতো জীবনের নানা ঘটনা তুলে ধরেন তিনি। ১৮৬৮ সালে ৬৭ বছর বয়সে ‘আমার জীবন’ নামে আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে ছোট ছোট ১৬টি রচনা। আর ৮৮ বছর বয়সে ১৫টি ছোট ছোট ঘটনা সম্বলিত দ্বিতীয় খণ্ড। মুগ্ধ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘বস্তুতঃ ইহার জীবনের ঘটনাবলী এমন বিস্ময়জনক এবং ইহার লেখায় এমন একটি অকৃত্রিম সরল মাধুর্য আছে যে, গ্রন্থখানি পড়িতে বসিয়া শেষ না করিয়া থাকা যায় না।’ ১৮৯৯ সালে রাসসুন্দরী দাসীর জীবনাবসান হয়।



