সরকারের চাপ ক্রমেই বাড়ছে
  • ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ‘ভোট চুরি’-র মতো গুরুতর অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত ভূমিকা ও এসআইআর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে দিল্লির রাজপথ এখন জনজোয়ারে ভাসছে। পুলিশি ব্যারিকেড, ১৪৩ বা ১৬৩ ধারার নিষেধাজ্ঞা কিংবা হাজার হাজার আধাসেনা মোতায়েন করেও মোদি সরকারের দমনপীড়ন ও স্বৈরাচারী মনোভাব যে আর জনরোষ আটকাতে পারছে না, গত সোমবারের ‘চলো দিল্লি’ প্রতিবাদ মিছিল তা আবার প্রমাণ করে দিল। কনট প্লেস থেকে শুরু করে বারাখাম্বা রোড, মান্ডি হাউস হয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত বিরোধী দল ও সাধারণ মানুষের এই বিপুল জমায়েত দিল্লির বুকে এক নতুন ইতিহাস রচনা করেছে।

Advertisement

গত কয়েক দিন ধরে কখনো বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক শিবির, কখনো বাম ছাত্র সংগঠন, আবার কখনো ককরোচ আন্দোলন বা জেন জি-র বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছে রাজধানী। কিন্তু সোমবারের এই মিছিল আগের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিল। বিরোধী মহাজোট ‘ইন্ডিয়া’র ডাকে প্রায় আড়াই লক্ষ মানুষ দিল্লির রাজপথে নেমে পড়েন। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী বলেন, ‘এটা তাণ্ডব। ভগবান শিবের নাচ। এর জন্য কোনো পরিকল্পনার প্রয়োজন নেই।’ কেন এমন মন্তব্য? কারণ, ধর্মেন্দ্র প্রধান বা জ্ঞানেশ কুমার বিরোধী আন্দোলনে বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের পরিকল্পনার চেয়ে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই মুখ্য হয়ে উঠেছে। নিট কাণ্ডে ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে পথে নেমেছিল ককরোচ জনতা পার্টি। সেই সময় রাহুল গান্ধী পৃথকভাবে প্রতিবাদ করেছিলেন বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিজেপি নেতৃত্বকে ফোন করেছিলেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই। মূল চালিকাশক্তি ছিল ককরোচরাই। তাঁদের আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত পদ ছাড়তে বাধ্য হন ধর্মেন্দ্র প্রধান। জেন-জি’দের সেই সাফল্যেই মোদি বিরোধী লড়াইয়ের অনুপ্ররেণা খুঁজে পেয়েছেন বিরোধীরা। তাই এবারে প্রতিবাদ মিছিলে পা মিলিয়েছেন রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। এই আন্দোলনের জেরে মোদি সরকারের অন্দরে ও প্রশাসনিক মহলে যে চরম অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট। রাহুল গান্ধী সংবাদিক সম্মেলন করে বিস্ফোরক দাবি করেছেন যে, সরকারের অন্দরের বহু সরকারি আধিকারিকের পাশাপাশি স্বয়ং নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারও নাকি যোগাযোগ রাখছেন। শুধু জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ নয়, নেপথ্যের মূল মাথাদের অপসারণের দাবি এখন জোরালো হচ্ছে। চাপ বাড়াতে সংবিধান ক্লাব থেকে বাসে চেপে সুপ্রিম কোর্টের অভিমুখে যাত্রা করেন বিরোধী নেতারা। নির্বাচন কমিশন, জ্ঞানেশ কুমার সহ সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর সংক্রান্ত নাগরিকের নাম বাদ পড়ার প্রতিবাদে মামলাও দায়ের করা হয়েছে। যদিও সেই মামলায় কিছু ত্রুটি থাকায় তা এখনও তালিকাভুক্ত হয়নি। তবে প্রতিবাদের এই ঢেউ আদালতের দোরগোড়ায় পৌঁছে যেতেই মোদি সরকারের উপর আইনি ও নৈতিক চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে সরকারও মরিয়া হয়ে দমননীতি ও প্রশাসনিক কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। গোটা যন্তরমন্তর চত্বরকে ‘ডি-নোটিফাই’ করে প্রতিবাদ-বিক্ষোভকে সংসদ ভবন থেকে ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে সরিয়ে দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। পূর্ব দিল্লির সিবিডি গ্রাউন্ড, উত্তর দিল্লির বুরারি বা রামলীলা ময়দানকে বিকল্প হিসাবে ভাবা হলেও, তার মধ্যে কয়েকটি স্থানে আবার নবরাত্রির মেলা চলায় তা কার্যত অসম্ভব। সরকারের এই পদক্ষেপে স্পষ্ট যে, তারা গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের কণ্ঠরোধ করতে চাইছে। কিন্তু ককরোচ বা নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, যন্তরমন্তর বন্ধ করে দিলে গোটা দেশই এবার ‘যন্তরমন্তর’ হয়ে উঠবে। পুলিশ প্রশাসনকে ২৪ ঘণ্টার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে জেন জি বুঝিয়ে দিয়েছে, ভয় দেখিয়ে বা নিষেধাজ্ঞা জারি করে এই স্বতঃস্ফূর্ত অসন্তোষ আর থামানো যাবে না।
উৎসবের মরশুমে দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে এই লাগাতার আন্দোলন প্রশাসনিক স্তরে মোদি সরকারের ঘুম উড়িয়ে দিয়েছে। বিজেপির আইটি টিমের হাজার চেষ্টার পরও নাগরিক সমাজের ক্ষোভ যে প্রশমিত হয়নি, তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং ককরোচদের এই যৌথ প্রতিরোধ শেষ পর্যন্ত মোদি-শাহ জুটির ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। আগামী দিনে এই আন্দোলন কোন রূপ নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত, ক্ষমতার অহংকার ভেঙে রাজধানীর রাজপথে সাধারণ মানুষের জয়যাত্রা শুরু হয়ে গিয়েছে।