এমাদাসি, সিদল থেকে নাকিমা: এবার পুজোয় উত্তরবঙ্গের স্বাদে তৃপ্তির খোঁজ
  • ১২ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সায়ন মজুমদার, কলকাতা: পুজো দোরগোড়ায়। কেজো একঘেয়ে জীবন থেকে কিছুদিনের মুক্তি। এই সময় মূলত দুই ধরনের বাঙালি দেখা যায়। একদল, যাঁরা নিজের এলাকায় থেকে চুটিয়ে ঠাকুর দেখেন, এগরোল-চাউমিন-বিরিয়ানি দিয়ে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ আর ডিনার সারেন। সঙ্গে মুখশুদ্ধি হিসাবে থাকে হজমির গুলি। আরেক দল আছেন, যাঁরা ব্যাগপত্তর গুছিয়ে টাটা বাইবাই। এখন সবার পক্ষে তো টানা অফিস কামাই মেরে বিদেশ বিভূঁই যাওয়া সম্ভব নয়। ওই চারদিনে ঘোরার সহজ, পরিচিত ডেস্টিনেশন উত্তরবঙ্গ (বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গবাসীদের ক্ষেত্রে)। কেউ পাহাড় দেখেন, কেউ ডুয়ার্সের জঙ্গল-আধা পাহাড় দেখেন। আর ওই চেনা ঢঙে বোরোলি আর মোমো খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন। 

Advertisement

আচ্ছা, এই বোরোলি মোমোর বাইরে কি আর কোনো খাবার নেই উত্তরে? কখনো সিদল খেয়েছেন? বা এমাদাসি, কেওয়াদাসি? এবার পুজোয় উত্তরে গেলে অবশ্যই চেখে দেখতে পারেন উত্তরের একেবারে নিজস্ব অভিনব এইসব খাবার। 
সবার আগে আসা যাক সিদলের কথায়। মূলত রাজবংশি খাবার, জলপাইগুড়ি আর কোচবিহারে বেশ চল আছে। বাংলাদেশের উত্তর অংশেও বেশ জনপ্রিয়। শুঁটকি মাছ, কচুর ডাটা একসঙ্গে ভালো করে বেটে, তাতে নানা মশলা আর সর্ষের তেল দিয়ে আলুভাতের মতো মেখে নেওয়া হয়। তা রোদে কিছুদিন শুকিয়ে নিলে দীর্ঘদিন সেটি খাওয়ার যোগ্য থাকে। গরম ভাত দিয়ে সিদলের ভর্তার স্বাদ অতুলনীয়। 
আলিপুরদুয়ারের বক্সা পাহাড়ে ভুটান সীমান্ত লাগোয়া এলাকায় বেশকিছু ডুকপা গ্রাম আছে। সেখানে পর্যটনস্থল হিসাবে লেপচাখা, বক্সা ফোর্ট, তাসিগাঁও বেশ জনপ্রিয়। এখানে খুব সহজেই ট্রেক করে পৌঁছানো যায়, আছে বেশকিছু হোমস্টে। এখন ভুটান ভ্রমণ বেশ খরচসাপেক্ষ। তাই বাজেটের মধ্যে ভুটানের স্বাদ নিতে চাইলে এই ডুকপা গ্রামে অবশ্যই আসতে হবে। ভুটানি সংস্কৃতি চাক্ষুষ করার পাশাপাশি চেখে দেখতে পারেন এমাদাসি, কেওয়াদাসির মতো ডুকপা পদ। দাসি (বা দাৎসি) কথার অর্থ চিজ বা পনির। এমাদাসি তৈরি হয় লাল বা কাঁচা লঙ্কার সঙ্গে পনির মিশিয়ে। আর কেওয়াদাসিতে পনিরের সঙ্গে থাকে আলু। দুটো পদই বেশ ঝাল ঝাল, ক্রিমি হয়। এছাড়া ননভেজ খেতে চাইলে পর্কদাসিও পাওয়া যায়। 
কোচবিহারের রাজবাড়ি, মদনমোহন মন্দিরের সুখ্যাতি সারা ভারতজুড়েই। এছাড়া শীতলপাটি, কাগজের পুতুল, মুখোশের মতো এই জেলার ১৩ রকমের হস্তশিল্পও বেশ বিখ্যাত। এই জেলার ভেটাগুড়ির জিলিপি, জামালদহের আমদই অবশ্যই চেখে দেখা দরকার। সেখান থেকে চলে আসা যাক জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়িতে। অনেকেই হয়তো জানেন না এই ময়নাগুড়িকে বলে ডুয়ার্সের প্রবেশদ্বার বা গেটওয়ে। জল্পেশ্বর, বটেশ্বর, জটিলেশ্বর বা পেটকাটির মতো হেরিটেজ মন্দির সার্কিট ঘুরতে চাইলে এখানে আসাই যায়। 
কেউ যদি বিন্দু, তোদে, তাংতা ঘুরতে যান, তাহলে অবশ্যই সেখানকার কিছু অনন্য পদ আস্বাদন করতে পারেন। ব্যাম্বু শুটের বিভিন্ন পদ থেকে শুরু করে স্থানীয় কিছু চালের ভাত, সেল রুটি সহযোগে তিল আলুর দমও পাওয়া যায়। এছাড়া মিলেট ও আটা মিলিয়েও একধরনের রুটি স্থানীয় বাসিন্দারা তৈরি করেন। লাভা, পেডং, ১২ মাইল বা তার কাছাকাছি পুডুং গ্রামে এলে কিনেমা খেয়ে দেখতে পারেন। এটা আসলে ফারমেন্টেড সয়াবিন। ঝাঁজালো গন্ধ রয়েছে। নানা মশলা মিশিয়ে এই কিনেমার পদ তৈরি করা হয়। এছাড়া আরও একটি বিশেষ পদ এখানে খুঁজলেই পাওয়া যায়। নাম নাকিমা। স্থানীয় বাসিন্দারা একধরনের ভোজ্য অর্কিডের (আদতে অর্কিড নয়, অ্যাসপারাগাস জাতীয় ভেষজ উদ্ভিদ) মঞ্জরি থেকে এক ধরনের আচার তৈরি করেন। মোমোর সঙ্গে এই আচার বেশ ভালো লাগবে। এই অঞ্চল ছাড়া এই কিনেমা কিন্তু আর কোথাও পাওয়া যায় না। 
এছাড়া কার্শিয়াং, কালিম্পং, দার্জিলিঙয়ের খাবারের বৈচিত্র্য নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার থাকে না। কথা হচ্ছিল অ্যাসোসিয়েশন ফর কনজারভেশন অ্যান্ড ট্যুরিজমের রাজ বসুর সঙ্গে। বললেন, উত্তরবঙ্গ তো শুধু কয়েকটা নির্দিষ্ট এলাকা নয়, এর প্রচুর বৈচিত্র্য। ভূপ্রকৃতির মতো প্রতিটা অঞ্চলে মানুষের রীতিনীতি, খাদ্যাভ্যাস  বলদে যায়। এখানে এমন কিছু পদ স্থানীয় মানুষরা তৈরি করেন, যা বাংলা তো বটেই, ভারতেরও অন্যত্র কোথাও পাওয়া দুষ্কর। তাই উত্তরবঙ্গকে চিনতে গেলে যেমন এখানকার নতুন নতুন এলাকা ঘুরে দেখতে হবে, তেমনই চেখে দেখতে হবে সেইসব মানুষের খাবারও।