সুদীপ্ত কুণ্ডু, হাওড়া: এক সময় এই বাড়িতে পা পড়েছে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় থেকে দেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডাঃ রাজেন্দ্র প্রসাদের। এসেছেন প্রণব মুখোপাধ্যায়ও। কংগ্রেসি জামানায় রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সালকিয়ার ঘোষবাড়ির দুর্গাপুজো তাই কেবল পারিবারিক উৎসব নয়, সময়ের দলিলও। আবার সত্তরের দশকের অশান্ত পরিস্থিতিতে এই বাড়িতেই বছরের পর বছর বন্ধ রাখতে হয়েছিল প্রতিমা পুজো। প্রায় দেড়শো বছরের সেই পুজো আজও বয়ে চলেছে অতীতের স্মৃতি আর বনেদিয়ানার ঐতিহ্য।
সালকিয়ার বেনারস রোডের পাশেই ঘোষ পরিবারের পুরানো বাড়ি। সামনের অংশ আধুনিক ইমারতে ঢাকা পড়েছে ঠিকই, কিন্তু ভিতরে ঢুকলে এখনও চোখে পড়ে পুরানো দুর্গাদালান, ঝুল-বারান্দা আর কড়ি-বরগার ছাদ। বাড়ির আনাচে-কানাচে যেন ছড়িয়ে রয়েছে কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি। পুজোর শুরু কানাইলাল ঘোষের হাত ধরে। শৈশবে বাড়ির পিছনে মাটি দিয়ে ছোট্ট দুর্গাপ্রতিমার আদল গড়েছিলেন তিনি। তা নজরে পড়ে তাঁর মা রাজলক্ষ্মীদেবীর। ছেলের তৈরি সেই মূর্তি বাড়িতে এনে প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। সেই থেকেই শুরু পুজো। সময়ের সঙ্গে বাড়ির পরিসর বদলেছে, বদলেছে অনেক আচারও। তবু একচালার প্রতিমায় ডাকের সাজ, বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে পুজোর যাবতীয় রীতি আজও অটুট। এক সময় কুমারী পুজো হত, অষ্টমীতে কামান দাগার চল ছিল। এখন সেই প্রথা বন্ধ। তবে দশমীতে ৩০ জন বেহারার কাঁধে দেবীকে গঙ্গায় নিয়ে গিয়ে বিসর্জনের রীতি এখনও বজায় রয়েছে।
পরিবারের পঞ্চম প্রজন্মের সদস্য সঞ্জয় ঘোষ জানালেন, অষ্টমীতে লুচি ভোগের পাশাপাশি দেবীকে ২০ কেজি চালের ভোগ নিবেদন করা হয়। পুজোর সময় বাইরে থাকা আত্মীয়রাও ফিরে আসেন বাড়িতে। এই বাড়ির ইতিহাসে রাজনীতির অধ্যায়টিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। পূর্বপুরুষ গৌরহরি ঘোষের আমন্ত্রণে বিধানচন্দ্র রায় মন্ত্রিসভার বহু সদস্য এসেছিলেন এখানে। এসেছিলেন বিধানচন্দ্র নিজেও। পা রেখেছিলেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডাঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ। ১৯৮২ সালে এসেছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়ও। তখন ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত চলত ভোজের আয়োজন। আজ সেই জৌলুস অনেকটাই ম্লান। সত্তরের দশকের অশান্ত সময়ে বহু বছর ঘট বসিয়ে পুজো করতে হয়েছে, হয়নি প্রতিমা পুজো। তবু ইতিহাসের নানা উত্থান-পতন পেরিয়ে ঘোষবাড়িতে আজও নিয়ম মেনেই দেবীর আরাধনা হয়। নিজস্ব চিত্র



