বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: বারুইপুরের নিতাই মজুমদারের মেয়ের জ্বর ছাড়ছে না। সেখানকার এ হাসপাতাল সে হাসপাতাল ঘুরে হয়রান। তারপর রেফার করে দেওয়ায় মেডিকেল কলেজে হাজির। এখানে আসার পর মেয়ে একটু ভালো আছে। চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। কিন্তু বারুইপুর থেকে অসুস্থ মেয়েকে অ্যাম্বুলেন্সে মেডিকেলে আনতে বেরিয়ে গেল কড়কড়ে দেড় হাজার টাকা।
উলুবেড়িয়ার সুবীর মণ্ডলেরও কমবেশি এক অভিজ্ঞতা। পেটের সমস্যায় গুরুতর অসুস্থ বাবা। রেফার করে দেওয়ার পর অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে এখানে আনতে হয়েছে। চার হাজার টাকা দিতে হয়েছে চালককে। অত টাকা কী করে যে বের করলাম, আমিই জানি—দুপুরে মেডিকেলে বলছিলেন সুবীরবাবু।
রাজ্যে বিপুল ভোটে জেতা বিজেপির সরকার গঠন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। স্বাস্থ্যের মতো জনস্বার্থবাহী দপ্তরে কী কী পরিবর্তন চান রোগীরা, চিকিৎসকরা, সাধারণ মানুষ? মঙ্গলবার সরকারি হাসপাতাল ঘুরে প্রথমেই যে দাবি জানালেন রোগীরা, তা হল রেফার্ড রোগীদের জন্য ফ্রি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা। মেডিকেলের অধ্যক্ষ অফিস থেকে ঢিলছোড়া দূরে একটি র্যাম্পে সপরিবারে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন নিতাইবাবুরা। বললেন, ‘সরকারি হাসপাতাল যদি রোগী রেফার করে, কেন অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া রোগীর বাড়ির লোককে দিতে হবে? কেন এক সরকারি হাসপাতাল থেকে অন্য সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স মিলবে না?’
আরও যে যে বিষয়ে তাঁরা পরিবর্তন চান, সেগুলি হল, প্রথমত, ‘ট্রলি খুঁজে পেতে কেন আমাদের ঘাম বেরিয়ে যায়? আর খুঁজে পেলে কেনই-বা তা আমাদেরই ঠেলে নিয়ে যেতে হবে? ট্রলিবয়রা কোথায়? কেন হাসপাতালে ভরতি থেকে লাইনে দাঁড়ানো সর্বত্র দালালরা ওত পেতে থাকে? কেন ওয়ার্ডে কেন সাহায্যের নাম করে হাত বাড়িয়ে থাকে কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত আয়া, ওয়ার্ডবয় বা গ্রুপ ডি কর্মী?’
সুবীরবাবুর সাফ কথা, ‘ওয়ার্ডে রোগী বা আমাদের সঙ্গে রোজ চূড়ান্ত দুর্ব্যবহার করে কিছু নার্স ও গ্রুপ ডি কর্মী। মানুষের করের টাকার সরকারি হাসপাতাল হয়েছে। এদের ভাবখানা হল, পরিষেবা দিয়ে যেন কিনে নিয়েছে আমাদের! এছাড়া আয়ুষ্মান ভারত কার্ড চালু হলে, তাতে ফ্রিতে স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার যাবতীয় সুযোগ সুবিধা মিলবে। হাসপাতালের সাইনেজ ব্যবস্থা, মানুষজনের জন্য পর্যাপ্ত জল, বাথরুম ও বিশ্রাম নেওয়ার ব্যবস্থা আরো ভালো করার আরজি জানিয়েছেন তাঁরা।
এ তো গেল রোগীর বাড়ির লোকজনের কথা। কী বলছে চিকিৎসকদের সংগঠন? সর্বভারতীয় চিকিৎসক সংগঠন ইউনাইটেড ডক্টর্স ফ্রন্ট জানিয়েছে, অভয়ার মা নিজেই স্বাস্থ্যক্ষেত্রে একজন চরম ভুক্তভোগীর স্বজন। তিনি যেন এবার পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যক্ষেত্রে যথেষ্ট দায়িত্ব পান। ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরাম ও অ্যাসোসিয়েশন অব হেলথ সার্ভিস ডক্টর্স-এর বক্তব্য, রাজ্যজুড়ে ডাক্তারদের কাজের পরিবেশ ভয়মুক্ত হোক। যেকোনো ‘থ্রেট কালচার’ ও দুর্নীতির ঘটনায় কঠিনতম ব্যবস্থা নিক প্রশাসন। স্বচ্ছ বদলি ও পদোন্নতি নীতি নেওয়া হোক। যাতে একে ওকে ধরে বছরের পর বছর কলকাতা বা বড় শহরের হাসপাতালে কেউ পড়ে থাকতে না পারেন। অন্যদিকে, মেডিকেল কলেজেগুলির প্রশাসনিক কর্তাদের একাংশের দাবি, রাজ্যের মধ্যে একমাত্র বালুরঘাটে কোনো মেডিকেল কলেজ নেই। হয় সেখানে মেডিকেল কলেজ হোক, নয়তো এবার উত্তরবঙ্গ পাক নতুন এইমস।