নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: ‘যদি গলাটা কেটে দাও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জিন্দাবাদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জিন্দাবাদ বলবে।’ গত নভেম্বরে কীর্ণাহারে সভা থেকে ঠিক এই ভাষাতেই গর্জে উঠেছিলেন কাজল শেখ। তৎকালীন বিরোধী দলনেতাকে বিঁধে বলেছিলেন, ‘তুমি জেলে যাওয়ার ভয়ে জামাটা পাল্টে নিয়েছ। কিন্তু কাজল শেখ জামা পাল্টাবে না।’ সেই কাজলকেই যখন মমতা-অভিষেককে ছেড়ে ঋতব্রত তৃণমূলে যোগ দিতে দেখছেন জেলার সাধারণ কর্মীরা, তখন তাঁদের বিস্ময়ের সীমা নেই। ক্ষুব্ধ নিচুতলার স্পষ্ট প্রশ্ন, ‘এতদিন কাজলের বিরুদ্ধে টেন্ডার দুর্নীতি থেকে অবৈধ বালিঘাট চালানো, তোলাবাজির যেসব অভিযোগ শুভেন্দুবাবু করতেন, সেগুলিই সত্যি ছিল? সিবিআই-ইডি থেকে পিঠ বাঁচাতেই কি এই ভোলবদল?’
সোমবার বিকেলে ‘টিম ঋতব্রত’ বৈঠক করে মমতা-অভিষেককে সরিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের নতুন চেয়ারম্যান করেছেন অরূপ রায়কে। গঠিত হয়েছে ২০ সদস্যের নতুন ওয়ার্কিং কমিটি। এরমধ্যে স্থান পেয়েছেন বীরভূম জেলার চার হেভিওয়েট—লাভপুরের প্রাক্তন বিধায়ক অভিজিৎ সিংহ ওরফে রানা, বোলপুরের বিধায়ক চন্দ্রনাথ সিংহ, হাসনের বিধায়ক তথা জেলা পরিষদের সভাধিপতি কাজল শেখ এবং রামপুরহাটের বর্ষীয়ান নেতা তথা পাঁচবারের বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁরা প্রত্যেকেই তৃণমূলের বীরভূম জেলা কোর কমিটির সদস্য ছিলেন, আশিসবাবু ছিলেন চেয়ারম্যান। কাজল ও চন্দ্রনাথ আগেই ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা মেনে ওই শিবিরে পা বাড়িয়েছিলেন। তাঁদের তুলে নেওয়া নিরাপত্তারক্ষী ফিরিয়ে দিয়েছে রাজ্য।
রাজনৈতিক মহলের দাবি, এই নতুন দল আসলে বিজেপিরই ‘বি টিম’। এনিয়ে কাজলকে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন মুরারইয়ের কংগ্রেস নেতা সঞ্জীবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এখনও তো কাজলের গলা কাটেনি। তার মানে কি আমরা বুঝে নেব গলাটা কাটতে পারে বলেই বিজেপির হাত ধরলেন? জেলা পরিষদের সরকারি প্রকল্পের টেন্ডার থেকে কাটমানি খাচ্ছিলেন, তোলা আদায় করছিলেন, তখন খুব ভালো লাগছিল? এখন বিজেপির মতো সাম্প্রদায়িক দলকে ঘুরপথে সমর্থন করলেন?’ এনিয়ে কাজল কোনো প্রতিক্রিয়া দিতেই রাজি হননি।
ক্ষোভ আছড়ে পড়ছে অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক তথা টানা পাঁচবারের বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরও। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যাঁকে পরম শ্রদ্ধা করতেন, একাধিক দপ্তরের মন্ত্রী থেকে বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার করেছিলেন। তাঁর বর্তমান অবস্থানকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলেই মনে করছেন বীরভূমের মানুষ। রামপুরহাটের এক প্রবীণ কর্মীর কথায়, ‘আশিসবাবু জীবনের যা পাওয়ার, কোনো কিছু থেকেই বঞ্চিত হননি। ৭৪ বছর বয়সে কোন স্বার্থে তাঁর এই পদক্ষেপের দরকার ছিল?’ আশিসবাবুওএ নিয়ে কিছু বলতে চাননি। একই ক্ষোভ বোলপুরের চন্দ্রনাথ সিংহের বিরুদ্ধেও। ২০১১ সাল থেকে টানা বিধায়ক ও মন্ত্রী হওয়া চন্দ্রনাথের এই শিবির বদলকে স্রেফ ‘পিঠ বাঁচানো’ হিসেবে দেখছেন কর্মীরা। কারণ, প্রাথমিক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় চন্দ্রনাথের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে লক্ষ লক্ষ নগদ টাকা উদ্ধার করেছিল ইডি। নিচুতলার বক্তব্য, ‘তদন্তের হাত থেকে বাঁচতেই উনি ওই শিবিরে গিয়ে বসেছেন।’ এনিয়ে প্রতিক্রিয়া মেলেনি চন্দ্রনাথেরও। অন্যদিকে, লাভপুরের প্রাক্তন বিধায়ক রানার বক্তব্য, সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক কাজে রানাকে দল ব্যবহার করে এলেও কোনোদিনই যোগ্য সম্মান দেয়নি। অথচ তিনিই ছিলেন জেলা রাজনীতির চাণক্য। শীর্ষ নেতৃত্বের উপর সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি শিবির বদলেছেন বলে তাঁর দাবি।
যে কর্মীরা রোদ-ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দলনেত্রীর ছবি বুকে নিয়ে লড়াই করেন, তাঁদের মনে এই নেতাদের জন্য শুধুই চরম অবজ্ঞা আর ধিক্কার জমেছে।