সংবাদদাতা, কৃষ্ণনগর: এক সময় কৃষ্ণনগরের প্রাণরেখা ছিল অঞ্জনা নদী। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল জনজীবন। পাশাপাশি কৃষি, মৎস্যচাষ সহ নানা জীবিকা। সারাবছরই নদী থাকত টইটম্বুর। নদীতে মিলত রুই, কাতলা, শোল সহ নানারকম মাছ। ভোর হতেই নদীর ঘাটে জাল, নৌকা নিয়ে হাজির হতেন মৎস্যজীবীরা। কিন্তু সংস্কারের অভাব, দখলদারি, দূষণ এবং জলপ্রবাহ কমে যাওয়ায় অঞ্জনা আজ মৃতপ্রায়। নদীর বিস্তীর্ণ অংশ ভরে গিয়েছে আগাছা, কচুরিপানায়। কোথাও কোথাও নদীর অস্তিত্বই মুছে গিয়েছে। তবে এখনও শক্তিনগর ও দোগাছি এলাকায় নদীর জলধারা টিকে আছে টিমটিম করে। টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে মৃতপ্রায় অঞ্জনায় জলস্তর কিছুটা বেড়েছে। সেই জলে দেখা মিলছে ছোটোবড়ো নানারকম মাছের। স্থানীয় মানুষ জাল ফেলে মাছ ধরতে নেমে পড়েছেন।
বর্ষার জল বাড়তেই শক্তিনগর ও দোগাছি এলাকায় অঞ্জনা নদীর বিভিন্ন ঘাটে ভিড় জমাচ্ছেন বহু মানুষ। কেউ কাঁধে বড় জাল নিয়ে নদীতে নামছেন, কেউ ছোট টানা জাল ফেলছেন, কেউ মশারি হাতে নেমে পড়ছেন। আবার কেউ ছিপ হাতে নদীর পাড়ে ধৈর্য ধরে বসে আছেন। সকাল থেকেই চলছে মাছ ধরা। তাদের জালে উঠছে বাটা, পোনা, তেলাপিয়া, রুই সহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। ছোট মাছই বেশি, তবে মাঝেমধ্যে বড় মাছও উঠছে। বড় মাছ জালে পড়লেই আনন্দে লাফিয়ে উঠছেন মৎস্যজীবীরা। কারণ বাজারে ভালো দাম মিলবে।
স্থানীয় জেলেদের কথায়, তিন-চার দশক আগেও অঞ্জনা নদীর চেহারা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নদীতে সারা বছর জল থাকত। প্রচুর দেশি মাছ পাওয়া যেত। এখন অঞ্জনা তো মরেই গিয়েছে। সারা বছর জলই থাকে না, মাছ কোথা থেকে পাওয়া যাবে। বর্ষার সময় অল্প কিছু পাওয়া যায়। আগে অনেক পরিবার মাছের ব্যবসায় যুক্ত ছিল। এখন তাঁদের বেশিরভাগই অন্য পেশায়।
নদী বিশেষজ্ঞ সুপ্রতিম কর্মকার বলেন, অঞ্জনা নদীর আগের নাম ছিল ক্ষীর নদী। নদীয়ায় অঞ্জনার মতো আরও ৩০টি নদী ছিল। সেগুলি সবই মরে গিয়েছে। অঞ্জনার মতো মৃতপ্রায় নদীগুলির সংস্কার করলে ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীদের দিনমজুর হওয়া থেকে বাঁচানো যাবে। কৃষ্ণনগরকে বাঁচাতেই অঞ্জনা নদীকে আবার বাঁচিয়ে তোলা প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দা বিক্রম দাস বলেন, বাবাদের মুখে শুনেছি আগে এই নদীতে বড় নৌকা চলত। তখন সারা বছরই নাকি প্রচুর জল থাকত এবং অনেক মাছ পাওয়া যেত। এখন তো চারিদিকে বাঁধ দিয়ে দিয়েছে। বর্ষা ছাড়া জল থাকেই না। অঞ্জনা নদীর সংস্কার হওয়া খুবই প্রয়োজন। এতে শুধু মাছের উৎপাদনই বাড়বে না, বহু পরিবারও রক্ষা পাবে।