১৯৩১ সাল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭০তম জন্মদিন। গুণমুগ্ধরা ঠিক করলেন, গুরুদেবের জন্মদিন উপলক্ষ্যে এবছর কিছু বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। সিদ্ধান্ত হল— এবছর কবিগুরুকে নিয়ে বই প্রকাশিত হবে। বাংলা ও ইংরেজিতে। দেশি-বিদেশি বরেণ্য ব্যক্তিত্বদের লেখা থাকবে তাতে। বইটির সম্পাদনার ভার পেলেন ‘দ্য মডার্ন রিভিউ’ এবং ‘প্রবাসী’ পত্রিকার সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। গভীর রবীন্দ্র-অনুরাগী রামানন্দকে সমান ভালোবাসতেন কবিও। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের থেকে কবিগুরু বয়সে ৪ বছরের বড় ছিলেন। যদিও সেই ছাপ তাঁদের বন্ধুত্বে কখনও পড়েনি। ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় লেখালেখি কিংবা বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠার সূত্রে দু’পক্ষের আন্তরিক হৃদ্যতা তৈরি হয়েছিল। ‘ভারতীয় সাংবাদিকতার জনক’ বলা হয় রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে। ১৮৬৫ সালে লালমাটির দেশ বাঁকুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাঁকুড়া জেলা স্কুলে পড়ার সময় অঙ্কের শিক্ষক ব্রাহ্মবাদী কেদারনাথ কুলভীর সংস্পর্শে এসে ব্রাহ্মধর্মে অনুরাগী হন। পরবর্তীতে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষাও নেন। পড়াশোনায় বরাবরই ভালো ছিলেন রামানন্দ। এন্ট্রান্স পরীক্ষায় চতুর্থ হয়েছিলেন। কলকাতা সিটি কলেজ থেকে বিএ পরীক্ষায় ইংরেজি অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। আবার ইংরেজি এমএ পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাসে চতুর্থ স্থান অধিকার করেন তিনি। শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতার মাধ্যমে দেশসেবায় ব্রতী রামানন্দ রিপন স্কলারশিপের মাধ্যমে ব্রিটেনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ হেলায় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কর্মজীবনে সিটি কলেজের ইংরেজি অধ্যাপক থেকে এলাহাবাদে কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবেও কার্যভার সামলেছিলেন তিনি। এরপর ধর্মবন্ধু, দ্য ইন্ডিয়ান মেসেঞ্জার, দাসী, প্রদীপ প্রভৃতি পত্রিকার সম্পাদনার অভিজ্ঞতায় ভর করে ১৯০১ সালে ‘প্রবাসী’ ও ১৯০৭ সালে ‘মডার্ন রিভিউ’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। শুরু হয় তাঁর সাংবাদিক জীবন। ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ জেনারেল ডায়ারের নেতৃত্বে জালিয়ানওয়ালা বাগের হত্যালীলার পর রামানন্দ তাঁর ‘দ্য মডার্ন রিভিউ’ পত্রিকায় বিস্তর লেখালেখি করেন। সে সময়ে এই নৃশংস ঘটনার প্রতিবাদে ‘নাইটহুড’ উপাধি ত্যাগের বিষয়ে দ্বিধায় পড়েন রবীন্দ্রনাথ। বিষয়টি নিয়ে তিনি রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ও শিক্ষাবিদ সিএফ অ্যান্ড্রুজের কাছে পরামর্শ চান। অ্যান্ড্রুজ রবীন্দ্রনাথকে উপাধি ত্যাগ করতে নিষেধ করলেও, রামানন্দ তাতে অনুমোদন দেন। শেষ পর্যন্ত বন্ধু রামানন্দের পরামর্শই গ্রহণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।



