হাওড়া জেলার অন্যতম ইতিহাস প্রসিদ্ধ স্থান উদয়নারায়ণপুর। একসময় এই এলাকা ছিল ভুরশুট বা ভুরিশ্রেষ্ঠ রাজ্যের অন্তর্গত। রাঢ় বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ইতিহাস। এখানকার বিধিচন্দ্রপুর গ্রামের প্রাচীন শিবমন্দিরকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর পালিত হয় অভিনব গাজন উত্সব। যার সঙ্গে মিশে রয়েছে নানা অলৌকিক কাহিনী। গাজনের কথা বলার আগে ফিরে যেতে হবে ইতিহাসে। কয়েকশো বছর আগে ভুরশুটের ক্ষমতাসীন রাজারা বিভিন্ন গ্রামে একাধিক শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাজা দেবনারায়ণ গড় ভবানীপুরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মণিনাথ শিবমন্দির। রাজা রুদ্রনারায়ণ কাষ্ঠসাংড়া গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন রুদ্রেশ্বর শিবমন্দির। একে একে সিংহাসনে বসেছিলেন রাজা উদয়নারায়ণ, রাজা সত্যনারায়ণ, রাজা শিবনারায়ণ এবং রাজা রুদ্রনারায়ণ। রুদ্রনারায়ণের পুত্র নাবালক হওয়ায় রাজসিংহাসনে বসেন তাঁর পত্নী রানি রায়বাঘিনী ভবশঙ্করী। তিনি ছিলেন বীরাঙ্গনা। প্রজাদের মুখে মুখে ফিরত রানির জয়গান। ভবশঙ্করী নিয়মিত সুড়ঙ্গপথে পুজো দিতে আসতেন বিধিচন্দ্রপুরের শিবমন্দিরে। জনশ্রুতি, ৫০০ বছর আগে পাতাল ফুঁড়ে উঠে আসে এই শিবলিঙ্গ। তাই তিনি স্বয়ম্ভুনাথ শিব। এখন শিবলিঙ্গ ঘিরে প্রাচীন এক প্রকাণ্ড বটগাছ। বর্তমানে বটগাছটাই যেন শিবমন্দির। বলা ভালো, গাছমন্দির। মাটি থেকে কয়েক ফুট নীচে শিবলিঙ্গ। প্রতি বছর গাজনের সময় মন্দির সংলগ্ন পুকুর থেকে কলসি করে জল এনে সেই শিবলিঙ্গকে স্নান করানোর রীতি রয়েছে। যে গর্তের ভিতরে শিবলিঙ্গ রয়েছে, তা ১০-১২ কলসি জলেই ভরে যাওয়ার কথা। কিন্তু কোনও কোনও বছর ১০০-১৫০ কলসি জলেও ওই গর্ত ভরে না। তখন পুরোহিতকে ক্ষমা প্রার্থনা করে পুজোর কাজ চালাতে হয়। এত জল কোথায় যে যায়, সে এক মস্ত রহস্য! গাজনের দিন বিধিচন্দ্রপুর সহ চিত্রসেনপুর, চাঁদচক, গুমগড়, ঘোল রঘুনাথপুর গ্রামের ৮০-৯০ জন সন্ন্যাসী মিলিত হয় রানির শিবমন্দির প্রাঙ্গণে। প্রথা মেনে শিবের মাথা থেকে ফুল পড়লে হয় ঝাঁপের সূচনা। বসে মেলা। কৌতূহলী মানুষ বটগাছে আবার শিবের সাপ খুঁজতে থাকেন। শোনা যায়, এই বটগাছে নাকি মাঝেমধ্যে সাদা রঙের বড় সাপের দর্শন মেলে!



