নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: কাটা তেলের কারবার থেকেই কোটিপতি! নেতা থেকে পুলিশ অফিসারদের একাংশ সম্পদের পাহাড় বানিয়ে ফেলেছেন। পূর্ব মেদিনীপুরে হলদিয়া-কোলাঘাট ১১৬নম্বর জাতীয় সড়কের দু’ধারে টিনঘেরা গোপন গুদামঘর যেন ‘গৌরী সেনে’র রত্নভাণ্ডার। নেতা-পুলিশ ও কাটা তেল কারবারিদের চক্র দু’হাতে এই অবৈধ ব্যবসা করে টাকা কামিয়েছে। সেই টাকায় কেউ তৈরি করেছেন পেট্রল পাম্প, কারও নার্সিংহোম হয়েছে। আবার, কেউ দীঘার সমুদ্রে ট্রলার থেকে পণ্যবাহী ট্যাঙ্কার কিনেছেন। নন্দকুমার থানার মাধবপুরে কয়েকজন কাটা তেলের ব্যবসায়ী দিল্লিতেও সম্পদের পাহাড় বানিয়েছেন। তদন্ত করে এই কারবারের সঙ্গে কারা যুক্ত তা প্রকাশ্যে আনার দাবি তুলেছে বিজেপি।
হলদিয়ার ব্রজলালচক থেকে তমলুক থানার নেতাজিমোড় পর্যন্ত ৪১নম্বর জাতীয় সড়ক বরাবর অন্তত ৪০টি জায়গায় তেল কাটিংয়ের কারবার চলত। এখনও বিক্ষিপ্তভাবে কিছু জায়গায় চলছে। কোলাঘাট ও পাঁশকুড়া থানা এলাকায় ৬নম্বর জাতীয় সড়ক বরাবর প্রায় ২০টি জায়গায় কাটা তেলের অবৈধ কাজকর্ম চলত। হলদিয়া শিল্পাঞ্চল থেকে বিভিন্ন জ্বালানি তেল সংস্থার টার্মিনাল থেকে দৈনিক গড়ে তিন-চার হাজার ট্যাঙ্কার রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় পাম্পের উদ্দেশে রওনা দেয়। টার্মিনাল থেকে বেরনোর পরই সেইসব ডিজেল, পেট্রলভর্তি ট্যাঙ্কার ঢুকে পড়ছে টিনেঘেরা তেল কাটিং পয়েন্টে। সেখানে ৫০-১০০লিটার পর্যন্ত ডিজেল, পেট্রল বের করে নেওয়া হয়। ওজন মেলাতে গাড়ির চেসিসের তলায় বালিভর্তি বস্তা, গোঁজ হিসেবে কেরোসিন, নানা কেমিক্যাল মেশানো হয়।
নন্দকুমার থানার মাধবপুর, ইড়খা, কামারদা, নারকেলদা, খঞ্চি, বাখরাবাদ এলাকা কার্যত তেলকাটিংয়ের স্বর্গরাজ্য। ২০১৫সালে মাধবপুরে একটি বড় তেলকার্টিং কারখানায় হানা দিয়েছিল নন্দকুমার থানার পুলিশ। সেই কারখানার কর্ণধার তমলুক শহরে শঙ্করআড়া বাজার সংলগ্ন এলাকায় নিজের নামে বিরাট ডায়াগনস্টিক সেন্টার খুলেছেন। আগামী দিনে নার্সিংহোম করার পরিকল্পনা রয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে তাতে শেয়ার রয়েছে পুলিশের এক সাব ইন্সপেক্টরের। এক পুলিশ অফিসার খড়্গপুরে পেট্রল পাম্প কিনে ফেলেছেন। তমলুক শহরে ফ্ল্যাট আছে। পাঁশকুড়া থানায় আইসি হিসেবে চাকরি করে দেওয়া এক ইন্সপেক্টরের আয় বহির্ভূত সম্পত্তির জন্য ভিজিলেন্স তদন্ত শুরু হয়েছে। মাধবপুরের আর এক কারবারি দীঘায় বহু ট্রলার ও পণ্যবাহী ট্যাঙ্কার কিনে ব্যবসা করেন। ৩০বছরের বেশি সময় ধরে তাঁর কাটা তেলের ব্যবসা চলছে।সম্প্রতি নন্দকুমারে পরপর দু’জায়গায় কাটা তেলের গুদামে ভয়াবহ আগুন লাগে। এধরনের তেল দিয়ে যানবাহন চলাচল করলে ইঞ্জিন দ্রুত ক্ষতি হয়। ভোজ্য তেলেও এই কারবার চলে। সেটা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। গত ৪মে রাজ্যে পালাবদলের পর পূর্ব মেদিনীপুরে লোটো, সাট্টার মতো অবৈধ কারবারের সঙ্গে কাটা তেলের কারবার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। তবে, এই অবৈধ কারবারে যেসব নেতা, পুলিশ অফিসার মদত দিতেন তাঁদের চিহ্নিত করার দাবি উঠেছে। বিপুল সম্পদের উৎস খোঁজা দরকার। তৎকালীন শাসকদলের অনেক নেতা এই কারবার থেকে মাসোহারা পেতেন। আর, পুলিশের একাংশের প্রত্যক্ষ মদতে চলত অবৈধ তেলকাটিং কারবার। এখন সেই কারবারে রাশ টানার পাশাপাশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ জড়িতদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সময়। বিজেপি নেতা আনন্দময় অধিকারী বলেন, তেলকাটিং কারবার অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার। সেইসঙ্গে এরসঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন সেটাও প্রকাশ্যে আসা উচিত।