


সজল মণ্ডল,রঘুনাথপুর: ‘সংসারে যারা শুধু দিলে, পেলে না কিছু’, কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অবহেলিত, নিপীড়িত মানুষদের জন্য একথা লিখেছিলেন। সেই কথাশিল্পীর পথ অনুসরণ করলে খুঁজে পাওয়া যাবে একদা দেশে স্বাধীনতা আনার জন্য এবং পুরুলিয়া জেলায় ভাষা আন্দোলনের জন্য শামিল একাধিক স্বাধীনতা যোদ্ধা আজও যেন প্রচারের আড়ালে রয়ে গিয়েছেন। সেই প্রচারের আড়ালে থাকা অন্যতম বীর বিপ্লবী, ভাষা সেনানী হলেন পুরুলিয়ার রঘুনাথপুর মহকুমা এলাকার ‘বীর রাঘব আচারিয়া’।
বীর রাঘব আচারিয়ার বাবা ছিলেন সুন্দর আচারিয়া। তিনি ছিলেন তামিলনাড়ুর পাপনাসনম গ্রামের বাসিন্দা। বিবাহ সূত্রে সুন্দর আচারিয়া তৎকালীন পুরুলিয়ার রঘুনাথপুর মহকুমার বেড়ো গ্রামে আসেন। সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানেই পাঁচ পুত্র ও দুই কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। ১৯০৩ সালে সর্বকনিষ্ঠ পুত্র হিসেবে বীর রাঘব আচারিয়ার জন্ম হয়। ছোট বেলায় বেড়ো গ্রামে পণ্ডিত মশাইয়ের কাছে টোলে পড়তেন। ছোটবেলা থেকেই রাজা রামমোহন রায়, স্বামী বিবেকানন্দ, ক্ষুদিরামের গল্প শুনতে ভালোবাসতেন। স্বপ্ন দেখতেন ভারত মায়ের শৃঙ্খলা মোচনের। তাই শিক্ষার পাশাপাশি সমানভাবে শরীর চর্চাও করতেন। পন্ডিত মশাই বুঝেছিলেন এই ছেলে অন্য ধাতু দিয়ে তৈরি।
বাঁকুড়া খ্রিস্টান কলেজে পড়ার সময় বীর রাঘব আচারিয়া বিভিন্ন স্থানে বিপ্লবীদের সঙ্গে সভায় যোগ দিতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে সরাসরি আন্দোলনে শামিল হন। ১৯২৭ সালে ঋষি নিবারণচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। দেশ তখন স্বাধীনতা আন্দোলনে উত্তাল। ঋষি নিবারণচন্দ্র দাশগুপ্ত ও স্বামী অসীমানন্দ সরস্বতী স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য ১৯২৯ সালে কারাগারে বন্দি হন। তখন জেলার একমাত্র পত্রিকা ‘মুক্তি’র সম্পাদনার ভার বীর রাঘব আচারিয়ার হাতে তুলে দেওয়া হয়।
এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, বিপ্লবী কার্যকলাপের জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে একাধিকবার গ্রেপ্তার করেছিল। মজফফপুর, হাজারিবাগ, মেদিনীপুরের সেন্ট্রাল জেল, লাহোর জেলে বন্দি জীবন কাটিয়েছেন। জীবনে দীর্ঘ ১২ বছর তিনি হাজত বাস করেছিলেন। দেশের এমন কোনও জেল নেই, যেখানে তাঁর ঠাই হয়নি। স্বাধীনতায় নিজেকে নিয়োজিত করে দেওয়ার জন্য সংসার করেননি। রাজনৈতিক কাজের জন্য যুগস্লাভিয়া, রাশিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া সহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি দেন। পোশাকেও ছিল স্বদেশী আন্দোলনের ছাপ। তিনি সর্বদা খাদির কাপড় পরতেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলা ভাষা আন্দোলনের জন্য লড়াই শুরু করেন। আনুমানিক ১৯৪৮ সালের সাঁতুড়িতে বহু ভাষা সৈনিককে নিয়ে জনসভা করেছিলেন। ১৯৫৬ সালের ২০ এপ্রিল পুঞ্চার পাকবিড়রা থেকে ১০২৫জন ভাষা সেনানী কলকাতার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিলেন। সেই পদযাত্রায় বীর রাঘব আচারিয়া ছিলেন।
১৯৭৭ সালে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী কমিটির সভাপতি ছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে তাম্রপত্র দিয়ে সম্মানিত করেছিলেন। শেষ জীবনে তিনি হাজারিবাগে বড় ভাতুষ্পুত্রের কাছে থাকতেন। বার্ধক্যজনিত অসুখের কারণে তাঁকে সরাইখেলা সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ১৯৯৩ সালে ভাতুষ্পুত্রের বাড়িতে একটি দুর্ঘটনা ঘটার জন্য মৃত্যুর সময় বীর রাঘব আচারিয়ার কাছে কেউ ছিলেন না। হাসপাতাল সুপার তাঁর পরিচয় জানার জন্য খোঁজ করতে গিয়ে বালিশের নীচে তাম্রপত্রটি পেয়েছিলেন। সেখানে পূর্ণরাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
এলাকার ক্ষেত্র গবেষক সত্যবান তন্তুবায় বলেন, বীর রাঘব আচারিয়া বিষয়ে খুব কম বেশি লোকেই জানেন। বর্তমানে রঘুনাথপুরের সালকা মোড়ে তাঁর একটি আবক্ষ মূর্তি রয়েছে। এত বড় বিপ্লবী প্রচারের আড়ালে রয়ে গিয়েছেন।