অভিষেক পাল, বহরমপুর: রেললাইনে একের পর এক দলা পাকানো দেহ। টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া দেহ খণ্ডগুলি ছড়িয়ে পড়েছিল রেললাইনের চারপাশে। ছোট্ট এক শিশুর দেহ থেকে মুণ্ড সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। সেই মুণ্ড বালতিতে ভরার সময় হাত কেঁপে উঠছিল অভিজ্ঞ পুলিশকর্মীদেরও। কোনোরকমে বালতিতে ভরে দেহাংশ নিয়ে আসা হয় মুর্শিদাবাদ মেডিকেলের মর্গে। মৃত চার ছাত্রীর বয়স ছয় থেকে নয় বছরের মধ্যে। কেউ গ্রেড ওয়ান, কেউ আবার তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। কারও মাথা থেঁতলে গিয়েছে, কারও আবার গাড়ির দরজায় পা পিষে গিয়েছে। দেহ উদ্ধারের পর প্রথমেই কর্ণসুবর্ণ রুরাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরাও আঁতকে ওঠেন। তারপর মৃতদেহগুলি মুর্শিদাবাদে মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়।
সব থেকে ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার হয় বছর ছয়েকের ফারহানার। অন্যদিনের মতো এদিন সকালে মেয়েকে স্কুলের পোশাক পরিয়ে দিয়েছিলেন ফারহানার মা। তাঁদের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, বহু মানুষ ভিড় করেছে। কেউ কাঁদছেন। কেউ আবার সান্ত্বনা দিচ্ছেন। আর ফারহানার মা রিনা বেগম শোকে পাথর হয়ে ঘরে বাইরে বসে ছিলেন। চোখের জল ফেলতেই তিনি বলেন, সকাল ৬টার সময় মেয়েকে গাড়িতে তুলেছিলাম। স্কুলে যেতে হবে বলে এক ডাকেই মেয়ে ঘুম থেকে উঠে পড়ে। ওকে প্রস্তুত করে স্কুল গাড়িতে চাপিয়ে দিয়েছিলাম। এরকমটা হবে কখনো ভাবিনি। আমাদের সব শেষ হয়ে গেল।
জেসিকার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, পড়শিরা ভিড় করেছেন বাড়িতে। জেসিকা যে আর নেই, তা এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না তার মা। নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতে বলছিলেন, আমার হাত থেকে শেষ জল খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল জেসিকা। বাড়ি থেকে বেরনোর সময় আমাকে বলেছিল, মা মনটা কেমন করছে, একটু জল দাও না।
কথা শেষ করতে পারলেন না জেসিকার মা। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
এদিন ভাগ্যক্রমে রক্ষা পেয়েছে খুদে পড়ুয়াদের সহপাঠী শ্রেয়া দত্ত। শরীর খারাপের জন্য অভিশপ্ত ওই স্কুল গাড়িতে এদিন সে ওঠেনি।
বেসরকারি ওই স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে শ্রেয়া। সে বলে, আমরা রোজ স্কুলে যাই। আমাদের গাড়িতে সর্বপ্রথম ওঠে ফারহানা, তারপরেই গাড়িতে চাপে জেসিকা শবনম পরে তামান্না পারভিন ও ইনসারুল রহমান। সবশেষে আমি গাড়িতে চাপি। এদিন শরীর খারাপ থাকায় আমি গাড়িতে উঠিনি। তাই রক্ষা পেয়েছি।