সন্দীপ স্বর্ণকার, নয়াদিল্লি: প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু দিল্লিতে তৃণমূলের সংসদীয় রাজনীতির ‘পতন’ ঘটল এক অদ্ভুত সমাপতনে। সোমবার বেলা ১২টায় যখন মোদি বিরোধী মহাজোট ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠকে, তখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের ৯ মোতিলাল নেহরু মার্গের বাসভবনে চলছে ‘অপারেশন লুটিয়েন্স’। ‘লোটাস’ অভিযানের অ্যাডভান্সড ফরম্যাট। কারণ, সেখানে উপস্থিত স্বয়ং বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রবিবার চার্টার্ড বিমানে দুই সাংসদ সঙ্গীকে নিয়ে দিল্লি আসার সময়ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হিসাব কষেছিলেন, ১৩ জন আছেন তাঁর সঙ্গে। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই সেই অঙ্ক বদলে গেল। দিল্লিতে মমতার উপস্থিতিতেই খানখান হয়ে গেল তৃণমূল। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে ২০ জনেরও বেশি তৃণমূল এমপির সই করা চিঠি জমা পড়ল। তাঁরা আলাদা ব্লক হিসাবে সমর্থন জানাবেন বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ’কে। যদিও অন্যতম এক বিদ্রোহী সাংসদের দাবি, সংখ্যাটা ২২ ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
বিরোধী জোটের ‘সম্মেলন’ ছাপিয়ে লোকসভার ১৪ তৃণমূল সাংসদ এবং এদিনই রাজ্যসভা তথা দল থেকে ইস্তফা দেওয়া সুখেন্দুশেখর রায়কে নিয়ে বৈঠকই সোমবার তোলপাড় ফেলল জাতীয় রাজনীতিতে। ভূপেন্দ্র যাদব ছাড়াও বৈঠকে ছিলেন নিশিকান্ত দুবে, বিপ্লব দেব, সি এম রমেশ। তৃণমূলের এম পিদের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব অন্ধ্রপ্রদেশের দলীয় সাংসদ রমেশকেই দিয়েছে বিজেপি। এদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার বিমানে তিনি আবার কলকাতাতেও পৌঁছে গিয়েছেন। মঙ্গলবার থেকে এমপিদের সঙ্গে তিনি দফায় দফায় বৈঠক করবেন।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গিয়েছে, অমিত শাহের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়ির বৈঠকে বিক্ষুব্ধ তৃণমূল সাংসদরা খোলাখুলি জানিয়েছেন, ‘মমতার নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের সঙ্গে থাকতে চাই না।’ তখন ভূপেন্দ্র পালটা বলেন, ‘কমপক্ষে ১৯ জন দরকার। না হলে তো বিজেপিতে যোগ দিলে দলবিরোধী আইনের কোপে পড়ে যাবেন!’ তখনই ঠিক হয়, তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে জেতা সাংসদ পদ আপাতত আর কেউ ছাড়বেন না। লোকসভায় তাঁরা আলাদা ব্লক বানিয়েই এনডিএ’কে সমর্থন দেবেন। সেই অনুযায়ী তৃণমূলের বিদ্রোহী এমপিদের সই করা চিঠি লোকসভার অধ্যক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে বলে বিক্ষুব্ধদের নেত্রী কাকলি ঘোষদস্তিদার জানান। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে মুখ্য সচেতকের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন বলে দলের বৈঠকে ঘোষণা করলেও লোকসভায় তা জানানো হয়নি। ফলে লোকসভার খাতায় এখনও তৃণমূলের মুখ্য সচেতক কাকলিই। সেই পদাধিকারেই তিনি স্পিকারকে চিঠি লিখে বলেছেন, ‘আমরা জনগণের রায়কে সম্মান করি এবং বিশ্বাস করি যে, আমাদের ভবিষ্যৎ এনডিএ’র সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। সেই অনুযায়ী আমরা এনডিএ’র অংশ হতে চাই।’ যদিও এদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত এমন কোনো চিঠির প্রাপ্তিস্বীকার স্পিকারের অফিস করেনি। তৃণমূলও দাবি করেছে, মুখ্য সচেতক হিসাবে কাকলিকে সরানোর চিঠি তারা দিয়েছে।
সকালের বৈঠক যদি প্রথম দফা হয়, দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় সন্ধ্যায়। এবি ১১ তিলক মার্গে শতাব্দী রায়ের বাংলোয়। সেই ‘নৈশ বৈঠক’ চলাকালীনই হাজির হন শুভেন্দু অধিকারী। মূল উদ্দেশ্য অবশ্যই এই নতুন ‘প্রেশার ব্লকে’র রূপদান। সূত্রের খবর, রাত ৮টা পর্যন্ত সেই বৈঠকে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সূত্রের খবর, কাকলি ঘোষদস্তিদারকে নেত্রী হিসাবে বিদ্রোহীদের কেউ কেউ মানতে চাইছেন না। সেটা সামাল দিতে আসরে নেমেছেন শুভেন্দু। খলিলুর ও আবু তাহেরকে দেখিয়ে শতাব্দী রায় বৈঠকে শুভেন্দুকে বলেন, ‘এঁদের দেখতে হবে।’ প্রত্যুত্তরে শুভেন্দু বলেছেন, ‘চিন্তা নেই। বিজেপির পতাকা ধরতে হবে না। জয় শ্রীরামও বলতে হবে না। তবে দেখবেন, আপনাদের সম্প্রদায়ের ভোট যাতে কংগ্রেসে শিফট না করে।’ শুভেন্দুর কটাক্ষ ছিল, ‘তৃণমূল যা অত্যাচার করেছে, ফল ভুগতেই হবে। তাই এখন তিন মাস চুপ করে ঘরে বসে থাকুন। না হলে বাইরে কোথাও চলে যান। আমরা ব্যবস্থা করে দেব। দেব ও তো সাংসদ। তিনি কিন্তু বাইরে ঘুরছেন, তাঁর বিরুদ্ধে তো জনরোষ নেই!’
এই ‘প্রেশার ব্লক’ যে ভারী হচ্ছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কারণ, মালা রায়, সাজদা আহমেদ, মিতালি বাগ, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, ইউসুফ পাঠানকেও টানার চেষ্টা চলছে। যোগাযোগের কথা স্বীকার করে সৌগত রায় বলেছেন, ‘আমার কাছেও বিজেপির দিল্লির নেতাদের ফোন এসেছিল। তবে আমি যাচ্ছি না। সুদীপের সঙ্গেও আমার কথা হয়েছে। ওরা যে কুড়িজনেরও বেশি একজোট হয়েছে বলে প্রচার করছে, তা মিথ্যা।’ যদিও তৃণমূলের অন্দরমহলে বিদ্রোহের আঁচ বাড়ছে বলেই খবর। আর তাই লোকসভার পর রাজ্যসভাও রয়েছে বিজেপির নিশানায়। সম্ভাবনা এখন দু’টি। প্রথম, বিদ্রোহী ২০’র বেশি হলে তাঁদের বিজেপিতে যোগদান করানো। ‘মহারাষ্ট্র মডেলে’ তৃণমূলের প্রতীক কেড়ে মমতাকে নিঃস্ব করে দেওয়া। দ্বিতীয়, ‘আসল তৃণমূল’ রূপে এই ব্লককে স্বীকৃতি। সেক্ষেত্রে চন্দ্রবাবু নাইডু-নীতীশ কুমার নির্ভরতা কমবে।