বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: বুড়ো হয়ে যাওয়া খিলানের উপর দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন ঠাকুর দালান। প্রশস্ত চাতালে রোদ্দুর এসে পড়ে বছরভর। রয়ে যাওয়া কাঠামোয় গঙ্গাজলের ছিটে আর ফুল-বাতাসা দিতে দিতে অবশেষে আশ্বিন আসে। দেবীর সাজে ঘরে ফেরেন উমা। উৎসবে ফেরে পরিবার। এককালের জমিদারির স্মৃতি বয়ে চলা নাটমন্দিরে তখন আলোর রোশনাই। বাংলার প্রাচীন পারিবারিক পুজোগুলির এই চেনা চালচিত্রে ধরা পড়ে যে পরিবারগুলি, তাদেরই অন্যতম কোন্নগরের মুখোপাধ্যায় পরিবার। ‘বেলতলা বাটি’ নামে বিশালাক্ষী সড়কের প্রাচীন বাড়িতে এবারও বাজছে আগমনীর সুর।
এক সময় উঠোনজুড়ে ছিল বেলগাছের রমরমা। পরিবারের সদস্যরা বলেন, দৈব মহিমায় প্রতি বছর দুর্গাপুজোর আগে বাড়ির মাঠে দেখা মেলে বেলগাছের চারার। এক সময় বেলগাছের আধিক্যের জন্যই এই বাড়ির নাম হয় ‘বেলতলা বাটী’। বাড়িতে পাঁচ খিলানের দুর্গা দালানেই প্রতি বছর তৈরি হয় দেবীর একচালা প্রতিমা। এই বাড়ির বয়স ৩০০ বছরের বেশি। প্রথমে এখানে বাস ছিল চট্টোপাধ্যায়দের। বহু বছর আগে নিঃসন্তান জগৎ চট্টোপাধ্যায় তাঁর আপন ভাগ্নে ঠাকুরদাস মুখোপাধ্যায়কে এ বাড়ি দিয়ে যান। ঠাকুরদাস মুখোপাধ্যায়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্যামাচরণ বিদ্যারত্ন ও দীনবন্ধু ন্যায়রত্ন ব্যস্ত থাকতেন সংস্কৃত চর্চা ও টোল নিয়ে। পরের প্রজন্মের চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায় প্রাথমিক জীবনে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সরকারি শুল্কদপ্তরে কাজ করতেন এবং বার্মা ও জাপানের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কাঠ ও তিসির ব্যবসা করতেন। পরে উপার্জিত অর্থে তিনি নিলামে খুলনা জেলার খড়িয়া ও পাইকগাছা অঞ্চলে জমি কিনে জমিদারি চালু করেন। পরবর্তীকালে তাঁর ছোটো ভাই পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায় তা দেখাশোনা করতেন। দেশভাগের সময় চলে যায় জমিদারি। টিকে থাকে বাড়িটি ও প্রাচীন কাল থেকে প্রচলিত দুর্গাপুজো। জমিদার চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায়ের আমলেই বেলতলা বাটী পুনর্নির্মাণ ও দুর্গা দালান নির্মাণের পর বাড়ির দুর্গাপুজো রাজকীয় মাত্রা প্রায়। পরবর্তীকালে দুর্গা দালানের একাংশ ভেঙে বিপর্যয় হওয়ায় সাময়িকভাবে পুজো বন্ধ থাকলেও ১৯৮৯ সালে ঘটপুজো ও ১৯৯০ সালে ফের প্রতিমা পুজো শুরু হয়। সময়ের নদী বয়ে চলেছে। উলটে চলেছে একের পর এক ইতিহাসের পাতা। শুধু একই রয়ে গিয়েছে আগমনীর আরাধনার রীতি। বাড়ির সদস্য সৈকত মুখোপাধ্যায় ও নতুন প্রজন্মের সাত্ত্বিকা মুখোপাধ্যায় জানালেন, গুপ্ত প্রেস ও কালিকা পুরাণ মতে পুজো হলেও, এই বাড়িতে বলি নিষিদ্ধ। বাড়ির সদস্যরা মিলেই প্রতিদিন মায়ের জন্য রান্না করেন পঞ্চব্যাঞ্জন ভোগ, পঞ্চমীতে নাড়ু পাকানোর মধ্যে দিয়ে শুরু হয় উপাচারের প্রস্তুতি। বিশেষত্ব থাকে ভোগেও। সপ্তমীতে সাত রকম ভাজা, অষ্টমীতে আট রকম ভাজা, সন্ধিপুজোয় আবার বিশেষ ভোগে দেওয়া হয়, তাতে থাকে কাতলা মাছের ঝোল। নবমীতে ন’রকম ভাজা। ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে মর্ত্যে আসতে পারেন না উমা। তাই সেই সময় অরন্ধনের পান্তা খাওয়ার সুযোগও হয় না তাঁর। তবে সেই সাধ অপূর্ণ রাখেন না পরিবারের সদস্যরা। দশমীর দিন বেলতলা বাড়ির পান্তা ভাত, পাঁচ রকম ভাজা, ডাল, কচুশাক, চালকুমড়ো, ইলিশের টক খেয়ে শ্বশুরবাড়ি কৈলাসে ফেরেন ঘরের মেয়ে। নবমীর দিনে নরনারায়ণ সেবার ধারা আজও অব্যাহত। জাঁকজমক খানিক কমলেও, নিয়ম নিষ্ঠায় ও আন্তরিকতায় কোনো ফাঁক না রাখারই চেষ্টা করে বর্তমান প্রজন্ম। ফাইল চিত্র



