শান্তিপুরের রায়বাড়ির প্রাচীন কুলোপতি দুর্গার পুজো, ‘আনন্দ নাড়ু’ ছাড়া দেবীর ভোগ অধরা
  • ১০ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সংবাদদাতা, রানাঘাট: প্রায় ৫০০ বছর আগে ভাদ্র মাসের কোনো দুপুরে শান্তিপুরের রায়বাড়িতে লাল পাড় শাড়ি পড়ে এক নারী এসে উপস্থিত হন। গৃহকর্তী বয়স্ক মহিলার কাছে খাওয়ার জন্য জল চান তিনি। কিন্তু, অতিথি সাধারণ পানীয় জল নয়, বাড়ির বিগ্রহের কাছে রাখা গঙ্গাজলের ড্রাম দেখিয়ে ওই মহিলা বলেন ওই জল খাবেন। গৃহকর্তী তাঁকে ওই ড্রামে থাকা গঙ্গাজল ও ঠাকুরকে দেওয়া নাড়ু খেতে দেন। জল ও নাড়ু খেয়ে, বাইরে তাঁর ছেলেমেয়েরা দাঁড়িয়ে রয়েছে বলে তিনি বাড়ির বাইরে চলে যান। এরপর গৃহকর্তী তাঁকে ডাকতে বাইরে গিয়ে দেখেন কেউ কোথাও নেই। সেই রাতেই ওই গৃহকর্তী স্বপ্নাদেশে ওই নারী মা দুর্গার রূপ ধারণ করে বলেন, আমি তোর বাড়িতে গিয়েছিলাম আমাকে চিনতে পারলি না? আগামী দিনে আমার পুজো করিস সংসারে মঙ্গল হবে। আর্থিক অনটন ও হাতে সময় কম থাকায় কীভাবে পুজো করবেন জানতে চাইলে দেবী বলেন, আমাকে কুলোয় করে পুজো করিস, তাতেই আমি সন্তুষ্ট হব।

Advertisement

এইভাবেই সূচনা হয় শান্তিপুরের রায়বাড়ির দুর্গাপুজোর। কুলোয় প্রতিমার মুখ এঁকে প্রথম বছর পুজো শুরু হয়েছিল বলে আজও এই বাড়িতে দেবী ‘কুলোপতিমা দুর্গা’ নামেই পরিচিত। বাড়ির ১৭তম বংশধর উজ্জ্বলকুমার রায় জানান, যদিও এখন মূর্তি গড়েই দেবীর পুজো হয়। রায়বাড়িতে দেবী মহিষাসুরমর্দিনী রূপে একাই পূজিত হন। এখানে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক বা গণেশের মূর্তি থাকে না। একসময় অত্যন্ত ধূমধাম ও আড়ম্বরের সঙ্গে এই পুজো হত। কালক্রমে পরিবারের সদস্যরা কর্মসূত্রে বিভিন্ন স্থানে বসবাস করেন। বর্তমানে দেবী আরাধনার খরচ বহন করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে রায় পরিবারকে।
পুজোর পাশাপাশি এই বাড়ির স্থাপত্যেও জড়িয়ে রয়েছে এক অনন্য ঐতিহ্য। রায়বাড়িতে এক বিরল ‘আট থামের ঠাকুর দালান’ রয়েছে। অর্থ সংকটের কারণে প্রাচীন এই দালান সংস্কার বা সংরক্ষণ করা পরিবারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাচীন এই ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারি সাহায্যের আবেদন জানানো হলেও এখনো পর্যন্ত কোন আর্থিক অনুদান মেলেনি বলে জানান পরিবারের সদস্যরা। তবে আশা না ছেড়ে আগামীতে আবার সরকারের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা।
রায়বাড়ির দুর্গাপুজোর আচার ও রীতিনীতিও বৈচিত্র্যময়। পঞ্চমীর দিন আনন্দ নাড়ু উৎসবের মাধ্যমে পুজোর আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। পরিবারের এয়োরা বিজোড় সংখ্যায় একত্রিত হয়ে চালের গুঁড়ো, নারকেল, গুড় ও তিল দিয়ে এক বিশেষ নাড়ু তৈরি করেন। যার নাম ‘আনন্দ নাড়ু’। রায়বাড়িতে যেকোনো শুভ কাজের আগেই ‘আনন্দ নাড়ু’ তৈরি করার রীতি রয়েছে। পুজোর দিনগুলিতে প্রতিদিন সন্ধ্যায় দেবীকে এই নাড়ু দিয়ে ভোগ নিবেদন করা হয়। নাড়ু ছাড়া দেবীর ভোগ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
পুজোর দিনগুলিতে দেবীকে প্রতিদিন কদবেলের চাটনি এবং অন্তত একদিন ওলের ডালনা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। এছাড়া দেবীর ভোগে অন্ন, খিচুড়ি ও পাঁচ রকমের ভাজা দেওয়া হয়। মহালয়া থেকে অষ্টমী পর্যন্ত বাড়িতে সম্পূর্ণ নিরামিষ খাওয়ার নিয়ম থাকলেও নবমীর দিন দেবীকে দেওয়া হয়, বাটা মাছ, ইলিশ মাছ ও মাছের মাথা দিয়ে পুঁইশাকের তরকারি। দেবীকে মাছ নিবেদনের পরই পরিবারের সদস্যেরা মাছমুখ করেন।
বিজয়া দশমীর দিন রায়বাড়িতে দধিকর্মার চল নেই। পায়েস খাইয়ে দেবীকে বিদায় জানানো হয়। ঐতিহ্য, ভক্তি এবং আর্থিক প্রতিকূলতার মাঝেই শতকের পর শতক ধরে বেঁচে রয়েছে শান্তিপুরের রায়বাড়ির এই প্রাচীন কুলোপতি দুর্গাপুজো।