Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

শিল্পশহরের রাজপথ থেকে স্মৃতির পাতায় ডাবল ডেকার দৈত্যাকার বাস

একসময় ইস্পাতনগরী দুর্গাপুরের রাস্তায় মাথা উঁচু করে একেবারে রাজকীয় মেজাজে দাঁপিয়ে বেড়াত লালরঙা দৈত্যাকার ডাবল ডেকার বাস

শিল্পশহরের রাজপথ থেকে স্মৃতির পাতায় ডাবল ডেকার দৈত্যাকার বাস
  • ১৪ মে, ২০২৬ ১৫:০৫
Prefer us on Google

সংবাদদাতা, দুর্গাপুর : একসময় ইস্পাতনগরী দুর্গাপুরের রাস্তায় মাথা উঁচু করে একেবারে রাজকীয় মেজাজে দাঁপিয়ে বেড়াত লালরঙা দৈত্যাকার ডাবল ডেকার বাস। বাসের উপরতলার খোলা জানালা দিয়ে শহরের রাস্তা, কারখানার ধোঁয়া ও সবুজ গাছপালা ঘেরা অপরূপ সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য মুখিয়ে থাকত স্কুল পড়ুয়া থেকে অফিসযাত্রীরা। কিন্তু আজ সেই ডাবল ডেকার বাস শুধুই স্মৃতির পাতায় বন্দি। নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই অজানা এই দোতলা বাসের অমলিন আভিজাত্য। 

Advertisement

আশি ও নব্বইয়ের দশকে দুর্গাপুরের পরিবহণ ব্যবস্থার অন্যতম মেরুদণ্ড ছিল এই দোতলা বাসগুলি। বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমের অধীনে থাকা এই বাসগুলি ছিল দুর্গাপুর স্টিল টাউনশিপ ও সংলগ্ন এলাকায় একেবারে ব্রিটিশ মেজাজের প্রতীক। 
বেনাচিতি থেকে সিটি সেন্টার, বিধাননগর থেকে স্টেশন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রুটে চলত এই ডাবল ডেকার। বাস আসার আগেই দূর থেকে শোনা যেত তার ভারী ইঞ্জিনের গর্জন। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে মানুষ তাকিয়ে দেখত দু’তলাবিশিষ্ট সেই চলমান দৈত্যকে। বিশেষ করে ছোটোদের চোখ বিস্ময়ে চড়কগাছ হয়ে যেত এই বাস দেখে। দোতলার একদম সামনের সিটে বসে চওড়া উইন্ডস্ক্রিন দিয়ে রাস্তার দৃশ্য দেখা ছিল অনেকটা ‘রয়্যাল রাইড’-এর মতো। দুর্গাপুরের চওড়া রাস্তা আর দু’ধারের সবুজ সারির বুক চিরে যখন বাসটি চলত, মনে হতো যেন এক চলমান অট্টালিকা শহরের রাজপথে ছুটে ঩঩বেড়াচ্ছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলায় শহরের গতিপথ, বদলায় পরিবহণ ব্যবস্থা। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, খুচরো যন্ত্রাংশের দুষ্প্রাপ্যতা, আকাশছোঁয়া জ্বালানি খরচ ও ফ্লাইওভারের উচ্চতা, সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে ব্রাত্য হতে শুরু করে এই দৈত্যাকার বাসগুলি। শেষ বাসটা কবে চলেছিল, কেউ মনে রাখেনি। শেষে গ্যারাজে জং পড়তে পড়তে নিঃশব্দেই হারিয়ে গেল ডাবল ডেকার বাস।
দুর্গাপুরের প্রবীণ বাসিন্দা তপন মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ, ছোটোবেলায় বাবার হাত ধরে প্রথম ডবল ডেকারে উঠেছিলাম। উপরের তলায় বসে পুরো শহরটাকে স্বপ্ননগরী মনে হতো। আজ ছেলে, মেয়েরা সেই আনন্দটা আর বুঝবে না।
বেনাচিতির এক প্রবীণ বাসিন্দা বিশ্বরূপ রায় অতীতে তাকিয়ে বলেন, নাতিকে নিয়ে রবিবার বিকেলে দোতলা বাসে চড়ে কুমারমঙ্গলম পার্কে যাওয়াটা ছিল উৎসবের মতো। এখন তো এসি বাস অনেক হয়েছে, কিন্তু সেই দু’তলায় বসে হাওয়া খাওয়ার আনন্দ আর নেই। সিটি সেন্টারের এক কোণে পড়ে থাকা ভাঙা যাত্রী শেডের দিকে তাকিয়ে অশীতিপর এক বৃদ্ধা মালতী দেবী জানান, ওখানেই দাঁড়াত ডাবল ডেকার। বাসে করে কলেজ যেতাম। বর্তমানে হয়তো আধুনিক এসি বাস, অ্যাপ ক্যাব কিংবা ই-রিকশার দাপটে শহরের যাতায়াত অনেক সহজ হয়েছে। তবুও ডাবল ডেকারের সেই নস্টালজিয়া আজও বয়ে বেড়ান দুর্গাপুরের বহু মানুষ।  বিবর্তন হয়তো উন্নতির লক্ষণ, কিন্তু কিছু অবলুপ্তি শহরকে করে তোলে কিছুটা রিক্ত, কিছুটা ধূসর। 

সম্পর্কিত সংবাদ