গণেশ মজুমদার, কালনা: যাত্রাশিল্পের শুভ মহরত মানেই রথযাত্রা। হারিয়ে যেতে বসা যাত্রা শিল্পের উন্মাদনা আবার ফিরছে গ্রাম থেকে শহরে। যাত্রা শিল্পকে হাতিয়ার করে অ্যামেচার যাত্রা শিল্পীরাও রোজগারের মুখ দেখছে। তৈরি হচ্ছে সেমি পেশাদার যাত্রা অপেরা। এমনই কালনা শহর ও শহরতলিতে গড়ে উঠেছে একাধিক সেমি অপেরা সংস্থা। এবারও রথযাত্রা উপলক্ষ্যে তাদের পৌরাণিক, সামাজিক বিভিন্ন পালার শুভ মহরত। সেমি অপেরার শিল্পীদের দাবি, বড়ো বড়ো নাম করা অপেরা যাত্রায় সিনেমা ও সিরিয়ালের শিল্পীদের চমক ভরা থাকলেও তাদের পালায় থাকে প্রাণের ছোওয়া, অভিনয়ের আন্তরিকতা।
এক সময় যাত্রাই ছিল গ্রাম থেকে শহরে বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম। যাত্রায় লোকশিক্ষা হয়। আজ আধুনিক যুগে বিনোদনের হাজারো মাধ্যমে হারিয়ে যেতে বসেছে যাত্রা শিল্প। এক শ্রেণির যাত্রা শিল্পীদের দাবি, যাত্রার পর বড়ো বিনোদনের মাধ্যম ছিল সিনেমা। আজ মোবাইলের যুগে সিনেমাতেও জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে। চলচিত্র জগত থেকে সিরিয়ালের শিল্পীরাও ভিড় করছেন যাত্রার মঞ্চে। এক সময় গ্রাম থেকে শহরে শখের অ্যামেচার যাত্রাশিল্পীরা পকেটের টাকা খরচ করে গ্রামের পুজো-পার্বণে যাত্রাপালায় অভিনয় করতেন। নিজেদের অভিনয়ের মুন্সিয়ানার পরিচয় দিতেন। বর্তমানে অ্যামেচার যাত্রাশিল্পীদের মধ্যে ভাবনার বদল হয়েছে। তারা উপলদ্ধি করেছেন, বছরে একটি পালাকে সঠিক মুন্সিয়ানায় গড়ে তুলতে পারলেই মানুষ তা গ্রহণ করবে। ফলে জন্ম নেয় সেমি পেশাদার অপেরা দল। চিৎপুরের বৃহত্তর বাজেটের যাত্রাপালা যেসব পুজো ও উৎসবের উদ্যোক্তাদের ক্ষমতার বাইরে থাকে। তারাই সেমি পেশাদার অপেরার দলকে নিয়ে অল্প বাজটে যাত্রা মঞ্চস্থ করে এলাকায় যাত্রাপ্রেমী দর্শকদের মনোরঞ্জনের চাহিদা মেটাচ্ছেন। তাতেই মূল পেশার বাইরে সেমি পেশাদার সংস্থায় যোগ দিয়ে একদিকে যেমন যাত্রায় অভিনয়ের শখ মিটছে, তেমনি দিনে পাঁচশো থেকে দুই-তিন হাজার টাকা আয়ের সুযোগ হচ্ছে।
কালনার একটি সেমি পেশাদার অপেরা অভিনেতা পিন্টু সাহা প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। যখন শিক্ষক হননি, তখন থেকেই শখের যাত্রা পালায় অভিনয় করে এসেছেন। তাঁর সঙ্গে অভিনয় করা শিল্পীরা কেউ চাষি, গোপালক, মৎস্যজীবী থেকে টোটো চালক। তার কথায় যাত্রাকে ভালবাসলে তবেই অভিনয় করা যায়। এবার তাদের পালা ‘জীবনের শেষ ঠিকানা’। যা শহরের চকবাজারের শতাব্দির প্রাচীন ব্রহ্মাপুজোয় প্রথম মহরত হিসাবে মঞ্চস্থ হবে। আর একটি সেমি অপেরার কর্ণধার অভিনেতা অরবিন্দ ঘোষ একজন ল্যাব টেকনিশিয়ান। কলেজ লাইফ থেকে যাত্রায় হাতে খড়ি। অ্যামেচার যাত্রায় শখের অভিনয়ে অনেকের কাছে জনপ্রিয়। এবার রথযাত্রায় তাদের ‘দ্রৌপদীর শাখা’ যাত্রাপালার শুভ মহরত। তাঁর কথায়, শখের অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে যেমন দৈনন্দিন জীবিকার সঙ্গে অতিরিক্ত রোজগার হয়। তেমনি অভিনয়ের বাইরে থাকা লাইট, মাইক ও ড্রেস কোম্পানির লোকেদের মধ্যে রোজগারের দরজা খুলে যায়। অনেক মহিলা শিল্পীরাও এগিয়ে আসছেন। পালা প্রতি আয় দুই থেকে তিন হাজার টাকা। বিগত দিনগুলিতে আমরা যেভাবে পালার বরাত পেয়েছি, তাতে আগামী যাত্রার ভবিষ্যৎ ভালর দিকে।
• প্রতীকী চিত্র