সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: ‘দুঃখের নদ’ বলা হয় দামোদরকে। ইদানীং তার এই বদনামী তকমার সঙ্গে জুড়েছে আরও একটি ভয়ংকর কথা—‘লাশ-বাহী!’ পাড়ে পোড়াও, ভাসিয়ে দাও নদে। ব্যাস, খেল খতম। খুনিদের কাছে এটাই এখন হয়ে উঠছে প্রমাণ লোপাটের সহজ পন্থা। ফলে, দামোদরের ঘাটে ঘাটে একটার পর একটা দেহ উদ্ধার হয়। ক’দিন তোলপাড় চলে। দৌড়ঝাঁপ করে পুলিশও। তারপর একদিন থেমে যায় তদন্ত। নাগালের বাইরে চলে যায় অপরাধীরা।
একটা সময় ছিল যখন দামোদরে সামান্য কোনো গবাদি পশু ভাসতে দেখলেও পাড়ের বাসিন্দাদের কৌতূহলের অন্ত থাকত না। জোট বেঁধে ভিড় করতেন। এখন দামোদরের জলে মানবদেহ ভেসে আসতে দেখেও অবাক হন না রায়না, জামালপুর বা খণ্ডঘোষ এলাকার বাসিন্দারা। বিষয়টি গা সওয়া হয়ে গিয়েছে সবার কাছে। পুলিশও বুঝে গিয়েছে দামোদরে ভেসে আসা বডি মানেই ‘অজ্ঞাত পরিচিত’। অনেক কাঠখড় পুড়িয়েও বডির পরিচয় উদ্ধার করা খড়ের গাদায় সূচ খোঁজার মতোই। তাই অনেক অফিসার ঘরোয়া আড্ডায় আফসোস করে বলেন, ‘দামোদর এখন অপরাধের নিরাপদ পিও। মানে প্লেস অব অকারেন্স।’ ‘নিরাপদ’ বলার অর্থ হল, দু-তিনদিন দেহ জলে পড়ে থাকলে এমনিতেই ফুলে ফেঁপে ওঠে। তারউপর দেহাংশ খুবলে খেয়ে পরিচয়ের অবশিষ্ট প্রমাণ লোপাট করে ফেলে মাছ, জলজ প্রাণিরা। পুলিশ দেহ উদ্ধারের পর অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলার রুজু করে। কিন্তু, তদন্ত করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেন তদন্তকারীরা।
তিন মাস আগের কথা. জামালপুরে বেরুগ্রামের বাসিন্দারা দামোদরের জলে এক মহিলার দেহ ভেসে আসতে দেখেন। স্রোত কম থাকায় এক পাড়ে দেহটি গাছের ডালে আটকে গিয়েছিল। মুখ ফুলে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। কোথা থেকে দেহটি ভেসে এসেছিল, কী তাঁর পরিচয়, এখনও পুলিশ জানতেই পারেনি। তবে, শুধু মহিলা নয়, পুরুষদের দেহও দামোদরের জলে ভেসে আসে। চলতি বছর জুন মাসে সেই জামালপুরের জোৎশ্রীরাম এলাকায় এক ব্যক্তির দেহ নদী থেকে উদ্ধার হয়েছিল। তার আগে রায়নাতেও দামোদরের জলে একাধিক ডেডবডি উদ্ধার হয়। মৎস্যজীবীদের জালেও বহুবার আটকে গিয়েছে যুবতী কিংবা যুবকদের দেহ। এক পুলিশ আধিকারিক বলছিলেন, সব সময় দামোদরের জলে তলিয়ে গিয়ে মৃত্যু হয়, এমনটা নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শ্বাসরোধ করে খুন করে দেহ জলে ফেলে দেওয়া হয়। সুতরাং খুনের জায়গা, মৃতার পরিচয় কোনওকিছুই জানা যায় না।
জামালপুরের বাসিন্দা শম্ভু রায় বলছিলেন, ‘বর্ষার সময় নদীর স্রোত অনেক বেশি থাকে। বহুদূর থেকে দেহ ভাসতে ভাসতে চলে আসে। নদীর বাঁকে গাছের ডাল বা অন্য কিছু পড়ে থাকলে দেহটি আটকে যায়। দামোদরে তলিয়ে গিয়ে কেউ মারা গেলে তাঁর পরিচয় জানা যায়। খণ্ডঘোষ, রায়নায় নদীর স্নান করতে নেমে অনেকেই তলিয়ে যান। তাঁদের দেহ উদ্ধার হয়। মূলত, স্থানীয় বাসিন্দারা দেহ উদ্ধারের চেষ্টা শুরু করেন। সেক্ষেত্রে দু’ এক কিলোমিটারের মধ্যেই দেহের সন্ধান মেলে। কিন্তু কাউকে খুন করে পুড়িয়ে স্রোতে ভাসিয়ে দিলে তাঁর পরিচয় জানা কার্যত অসম্ভব।
সেই কারণেই হয়তো আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে খুনিরা। বর্ধমানে একের পর এক হত্যাকাণ্ড সেটাই ইঙ্গিত করছে।



