Bartaman Logo
২৭ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

১০ হাজারের ডিসিআর মিলছে ২০০০ টাকায়! বীরভূমের পাথর বলয়ে জাল চালানের রমরমা

বীরভূমে ২০০০ টাকায় ১০ হাজার টাকার ডিসিআর পাওয়া যাচ্ছে। প্রশাসন জালিয়াতির বিরুদ্ধে নজরদারি বাড়াচ্ছে। বিস্তারিত পড়ুন।

১০ হাজারের ডিসিআর মিলছে ২০০০ টাকায়! বীরভূমের পাথর বলয়ে জাল চালানের রমরমা
  • ২৭ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: মাত্র ২ হাজার টাকা ফেললেই লরি চালকদের পকেটে চলে আসছে ১০ হাজার টাকার বৈধ সরকারি ডিসিআর। বীরভূমের পাথর বলয়ে রাজকোষ লুটের এই ছবি ঘুম উড়িয়েছে জেলা প্রশাসনের। পাচামি, শালবাদরা, রামপুরহাট, নলহাটি, সুলতানপুর বা রাজগ্রামজুড়ে প্রাতিষ্ঠানিক লুটের যে চেনা ছক তৈরি করেছিল আগের সরকার, নতুন জমানার কড়াকড়িতে তাতে কুঠারাঘাত করা গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু দুর্নীতিকে যে পুরোপুরি উপড়ে ফেলা যায়নি, ‘নকল ডিসিআর’-এর এই রমরমা কারবারই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

Advertisement

তৃণমূলের জমানায় এই ডিসিআরকে কেন্দ্র করে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব লুট হয়েছে বলে অভিযোগ। রাজ্যের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় দাবি করেছিলেন, তৃণমূল জামানায় অন্তত দশ হাজার কোটি টাকা পাথর থেকে লুট হয়েছে। ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই মাফিয়া রাজ খতম করতে জেলা প্রশাসন, ভূমিদপ্তর, এমভিআই ও পুলিশকে যৌথভাবে রাস্তায় নামানো হয়। ফলও মেলে হাতেনাতে। দিনকয়েক আগেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় দাঁড়িয়ে দাবি করেছিলেন, বীরভূমের পাথর খাদান থেকে আগের জমানায় বছরে যেখানে মাত্র ৭ কোটি টাকা রাজস্ব আসত, সেখানে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র দেড় মাসের মধ্যেই তা বেড়ে ৮৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই রাজস্ব মাসে ১০০ কোটি ছুঁয়ে ফেলবে। কিন্তু সেই ‘বজ্র আঁটুনি’র আড়ালেই এবার চওড়া হচ্ছে ‘ফস্কা গেরো’। 
মেঠো বাস্তব বলছে, বর্তমানে পাথর বলয়ে সিংহভাগই ১৮ চাকার পেল্লাই ডাম্পার চলে। একেকটি গাড়িতে প্রায় ৪০ টন পাথর পরিবহণ করা হয়, যার আসল ডিসিআর মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার টাকা। অথচ চেকগেটের তোয়াক্কা না করে মাত্র ২ হাজার টাকা দিলেই মিলছে হুবহু সরকারি লোগো ও সিলমোহর দেওয়া জাল রসিদ। এনিয়ে প্রশাসন নজরদারি চালাচ্ছে। ধরাও পড়ছে। তবে সংখ্যাটা নগন্য! সম্প্রতি ধরা পড়া লরি চালক শেখ সালাম অকপটে স্বীকার করেছে, ‘দু’ হাজার টাকা দিয়ে শেখ রাহুল নামে এলাকারই একজনের থেকে এই চালান কিনেছিলাম।’ 
এই জালিয়াতির প্রধান কারণ হল সম্পূর্ণ কাগজে-কলমে চলা প্রাচীন ব্যবস্থা, যেখানে কোনো অনলাইন ট্র্যাকিং নেই। কম্পিউটারে নিখুঁতভাবে তৈরি এই জাল রসিদের সঙ্গে আসলের ফারাক কেবল সিরিয়াল নম্বরে, যা খালি চোখে ধরা অসম্ভব। চেকগেটে গাড়ি আসার আগেই চালক বা মালিকদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে এই ভুয়ো কাগজ। ভূমিদপ্তরের এক আধিকারিক আক্ষেপের সুরে জানান, ‘কাগজের রসিদ ঘেঁটে সিরিয়াল নম্বর মেলানোর এই মস্ত হ্যাপার সুযোগই নিচ্ছে কারবারিরা। একবার গাড়ি পেরিয়ে গেলে আর ধরার পথ থাকে না।’ এদিকে বীরভূমের ৯টি চেকগেটে পাহারার জন্য কর্মী সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। আধিকারিকের সংখ্যা হাতেগোনা।  ফলে ধীরগতির নজরদারির সুযোগ নিয়ে এবং গেটের এক শ্রেণির কর্মীদের ‘সন্তুষ্ট’ করে পার পেয়ে যাচ্ছে শ’য়ে শ’য়ে লরি। এই চক্র ভাঙতে জেলা ট্রাক ও ট্রিপার ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক মুন্না হোসেন খান স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁরা স্বচ্ছ ব্যবসা চান এবং এই জালিয়াতি রুখতে অবিলম্বে অনলাইন চালানের দাবি জানাচ্ছেন। এখন দেখার, রাজকোষের এই চোরাপথ বন্ধ করতে সরকার ডিজিটাল প্রযুক্তির দিকে হাঁটে, নাকি চেনা দুর্নীতির চক্করেই ঘুরপাক খায়। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ