নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া: সরকারি জমি দখল করে তৈরি হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসের পার্টি অফিস। ভোটের পর পালাবদল হলে সেখানে বিজেপির পতাকা উড়বে, এমনটাই স্বাভাবিক ছবি হতে পারত। কিন্তু দক্ষিণ হাওড়ার দানেশ শেখ লেনের ৪২ নম্বর বাসস্ট্যান্ডের উলটো দিকের সেই জায়গায় দেখা গেল একেবারে অন্য ছবি। বন্ধ পার্টি অফিসের দরজা খুলে দেওয়া হল বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের জন্য। এমনকি, সেই শিশুদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী জোগাড় করতে এই প্রথম সেখানে আস্ত একটি মেলারও আয়োজন করা হয়েছে। মেলার স্টল ও প্রবেশ মূল্য থেকে সংগৃহীত টাকা খরচ হবে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু সামগ্রী ক্রয় এবং পরিষেবার ব্যবস্থা করতে। দানেশ শেখ লেনের ওই পার্টি অফিসেই এখন জড়ো হয় প্রায় ৬৫ জন বিশেষভাবে সক্ষম শিশু। পালাবদলের পর স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বের সহযোগিতায় ঘরটির দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে তাদের জন্য। সেখানে তৈরি হয়েছে ওদের জন্য অ্যাক্টিভিটি সেন্টার। সপ্তাহে চারদিন নিখরচায় চলে যোগ অনুশীলন এবং ভোকাল থেরাপির ক্লাস। দেখভাল করেন স্থানীয় বাসিন্দা সমীর কর্মকার ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু।
এই গোটা উদ্যোগের পিছনে রয়েছে সমীরবাবুর পরিবারের গভীর শোক। ২০২৪ সালের অক্টোবরে ১৪ বছরের বিশেষভাবে সক্ষম ছেলে সান্নিধ্যকে হারান তিনি ও তাঁর স্ত্রী তনুশ্রীদেবী। বহু চেষ্টা করেও সন্তানকে বাঁচাতে পারেননি তাঁরা। সেই শোকের মধ্যেই অন্য বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের জন্য কিছু করার তাগিদ তৈরি হয়। সান্নিধ্যের বন্ধুদের নিয়েই তাঁরা শুরু করেন ছোটো ছোটো অ্যাক্টিভিটি সেশন। কখনো কারও বাড়ির ছাদে, কখনো উঠোনে চলত কর্মশালা। সমীরবাবুর কথায়, ‘ওরা বেশিরভাগই অভাবী পরিবারের সন্তান। ওদের জন্য একটা স্থায়ী জায়গা দরকার ছিল। এখন ওরা এখানে নিয়মিত আসতে পারছে, ভীষণ আনন্দে ক্লাস করছে। এটাই সবচেয়ে বড়ো পাওনা।’
আর সেই শিশুদের জন্যই এবার সেখানে অন্যরকম এক মেলার আয়োজন করা হয়েছে। দানেশ শেখ লেন রামনবমী কমিটির তৎপরতায় মেলার মাঠের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন পুর ও নগরোন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী উমেশ রাই। শুরু হয়েছে ১৫ আগস্ট। এই ‘প্রতিবন্ধী উন্নয়ন মেলা’ চলবে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চলা মেলায় জনপ্রতি ১০ টাকা প্রবেশমূল্য। স্টল ও প্রবেশ মূল্য থেকে সংগৃহীত অর্থ খরচ হবে শিশুদের বিশেষ চেয়ার, ম্যাট, স্পিচ থেরাপি ও স্পেশাল এডুকেটরের ব্যবস্থায়।
এখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই মেলার মঞ্চের সামনে যেন বদলে যায় চারপাশটা। ছোটো ছোটো হাত, ছোটো ছোটো গলায় তখন ফুটে ওঠে বড়ো বড়ো স্বপ্ন। কেউ নাচে, কেউ গান গায়, কেউ আবৃত্তি করে, কেউ-বা ছবি এঁকে নিজের মনের কথাগুলি ছড়িয়ে দেয় চারদিকে। মঞ্চের আলোয় একের পর এক শিশুর প্রতিভার মুক্তো ছড়িয়ে পড়ে, আর হাততালিতে ভরে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ। ফুচকা, চাট, হরেকরকম খেলনা, বইয়ের স্টলের ভিড়ের মধ্যেও তাই এই মেলার আসল আকর্ষণ সেই ছোট্ট মঞ্চটি।
মেলার অন্যতম উদ্যোক্তা বিজেপি নেতা বরুণ বারিকদার বলেন, ‘আমরা ওদের স্পেশাল চাইল্ড বলি। কিন্তু ওদের ভাবনার ব্যাপ্তি আমাদের চেয়েও অনেক দূর বিস্তৃত।’ জেলার প্রথম এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন এলাকার বাসিন্দারাও। নিজস্ব চিত্র