নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: সই জাল কাণ্ডের তদন্তে মঙ্গলবার দুপুরে তৃণমূল সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়িতে হানা দিল সিআইডি। ৩০, বি, হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের ওই ঠিকানাতেই রয়েছে তৃণমূলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। প্রায় একই সময়ে সিআইডির অপর একটি টিম পৌঁছে যায় ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কার্যালয়ে। দু’জায়গাতেই প্রথমে কিছুটা বাধার সম্মুখীন হলেও, তা উপেক্ষা করেই ঢুকে যায় সিআইডি টিম। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কালীঘাট ও ক্যামাক স্ট্রিটে পৌঁছে যায় কেন্দ্রীয় বাহিনী। সিআইডি সূত্রের খবর, ৭০ জন বিধায়কের সই সম্বলিত যে চিঠিতে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার প্রস্তাব বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন বসুর কাছে জমা পড়েছিল, তার মধ্যে বেশ কিছু সই ‘জাল’ বলে অভিযোগ ওঠে। সেই অভিযোগেরই তদন্ত করছে সিআইডি। তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে জানা গিয়েছে, বিধায়কদের সই সম্বলিত সেই প্রস্তাবনাপত্রের ‘অফিস কপি’র খোঁজেই তারা তৃণমূলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হানা দিয়েছিল। খানাতল্লাশি করেও দু’টি জায়গা থেকেই কিছু মেলেনি। মমতা এবং অভিষেক কেউই তখন সেখানে ছিলেন না। ঘণ্টাখানেকের বেশি সময় ধরে সবকিছু খতিয়ে দেখার পর সিজার লিস্টে ‘নিল’ লিখে জমা দিয়ে যায় সিআইডি। তবে এই পর্বে ভবানীভবনে হাজিরার জন্য অভিষেকের অফিসে একটি নোটিসও দিয়ে আসা হয়। সেখানে বলা হয়, এদিনই বিকাল সাড়ে পাঁচটার মধ্যে ভবানীভবনে হাজির হতে হবে অভিষেককে। নির্ধারিত সময়সীমার আগেই অভিষেকের তরফে চিঠি দিয়ে সিআইডিকে জানিয়ে দেওয়া হয়, তিনি বাইরে (দিল্লিতে) রয়েছেন। তাছাড়া বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থও হয়েছেন। মামলাটি বিচারাধীন। ১০ জুন পরবর্তী শুনানি। তাই যেতে পারছেন না। প্রসঙ্গত, সই জাল কাণ্ডে রক্ষাকবচ চেয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন অভিষেক। আজ, বুধবার সেই মামলারই শুনানি।
এদিন বেলা ৩টে ২০ নাগাদ হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে মমতার বাড়িতে পৌঁছায় সিআইডির ৩০ জন আধিকারিকের একটি টিম। পুরুষ আধিকারিকদের সঙ্গে মহিলারাও ছিলেন সেই টিমে। গেট দিয়ে বাড়িতে ঢোকার সময় প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ শুভাশিস চক্রবর্তী সিআইডি টিমকে বাধা দেন। তিনি বলেন, ‘যাঁদের নামে নোটিস, তাঁরা বাড়িতে নেই। আমি আপনাদের ঢোকার অনুমতি দিতে পারব না।’ সিআইডি আধিকারিকরা বলেন, আপনি কে? কোন পদে আছেন? শুভাশিসবাবুকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি কোনো পদে নেই। কিন্তু যাঁদের নামে নোটিস, তাঁরা কেউ বাড়িতে নেই। ফলে আমি আপনাদের অ্যালাও করতে পারছি না।’ এরপরও সিআইডি ওয়ারেন্ট দেখিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করলে তাঁর উত্তর ছিল, ‘এর ফল আপনাদের ভুগতে হবে।’ সিআইডি আধিকারিকরাও বলেন, ‘সার্চের জন্য আপনার অনুমতি নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।’ তর্কবিবাদে জড়িয়ে যায় দু’পক্ষই। শুভাশিসবাবুর বাধা উপেক্ষা করে এরপর মমতার বাড়িতে প্রবেশ করে সিআইডি টিম। বাড়ির চত্বরে আর এক দফা ‘চাপানউতোরে’র পর অবশেষে তৃণমূলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢোকেন তদন্তকারীরা। নেত্রীর বাড়িতে সিআইডি হানার খবর পেয়ে ততক্ষণে চলে আসেন বিধায়ক কুণাল ঘোষ ও মদন মিত্র। দিল্লি থেকে বিকালে কলকাতায় ফিরছিলেন মমতার সহযোগী সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বিমানবন্দরে ‘চোর’, ‘চোর’ আওয়াজ শুনে মেজাজ হারান তিনি। তারপর কালীঘাটের খবর পেয়ে সোজা চলে আসেন সেখানে। সিআইডি আধিকারিকদের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে যান তিনিও। খড়্গহস্ত হন সিআইডি এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে। কল্যাণ বলেন, ‘যেখানে মিটিং হয়েছে, সেখানে রেজল্যুশনের কপি থাকবে, তার কোনো অর্থ নেই। সিআইডি কিছুই জানে না। সেই কারণেই তল্লাশির নামে এই হেনস্তা।’ অপরদিকে সিআইডির বক্তব্য, বিধানসভার অধ্যক্ষের কাছে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ৭০ জন বিধায়কের সই সম্বলিত যে চিঠি জমা দিয়েছিলেন, তাতে ৩০ বি, হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের ঠিকানা ছিল। তৃণমূলের অফিসে রেজল্যুশনের অফিস কপিটাই খুঁজতে যাওয়া হয়েছিল। সেই অফিস কপিটা কোথায়? কে নিল? কে সরাল?