অতূণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: শৈলশহরে চলছে টানা বন্ধ। যানবহন বন্ধ থাকায় জনজীবন প্রায় স্তব্ধ। দুর্গোৎসবও একপ্রকার বন্ধের মুখে। ষষ্ঠীতে বেলার দিকে একটি গাড়ি এল। দেখা গেল গাড়িতে দুর্গা সপরিবারে এসে উপস্থিত হলেন দার্জিলিংয়ে রামকৃষ্ণ বেদান্ত আশ্রমের দরজায়। আশ্চর্য হলেন মঠের সন্ন্যাসীরা। মাকে সাদরে বরণ করে নিয়ে গেলেন নাটমন্দিরে। অন্যান্য বছরের মতো শুরু হল বিধিমতো দুর্গার অর্চনা।
শ্রীরামকৃষ্ণের অন্যতম পার্ষদ স্বামী অভেদানন্দ ১৯২৫ সালের কালীপুজোয় দার্জিলিং আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরের বছর থেকে ঘটে দুর্গার আরাধনা শুরু। বেলুড় মঠে যেমন স্বামীজী দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন, তেমনই দার্জিলিংয়ে স্বামী অভেদানন্দের হাত ধরে শুরু দুর্গাপুজো। কয়েক বছর ‘ঘটে পটে’ পুজোর পর শুরু হয় দুর্গাপ্রতিমা এনে পুজো। শিলিগুড়ির কুমোরটুলি থেকে মূর্তি ও পুজোর সামগ্রী কিনে নিয়ে যাওয়া হয় দার্জিলিং। এক শতাব্দী ধরে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা মতে বিধি পালন করে হচ্ছে এই আশ্রমিক পুজো। শতবর্ষে পা দেওয়া পুজোয় নেই শহুরে কোলাহল। কোনো বাহ্যিক আড়ম্বরও নেই। প্রথমদিকে পাইন কাঠের আশ্রম থাকলেও পরে গড়ে ওঠে পাকা মন্দির, ছাত্রাবাস, স্কুল। ১৯৭৬ সালে রামকৃষ্ণ মঠের তৎকালীন অধ্যক্ষ স্বামী বীরেশ্বরানন্দ এখানে শ্রীরামকৃষ্ণের মর্মর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। বেদান্ত মঠের অধ্যক্ষ স্বামী সদাত্মানন্দ, স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ, বেলুড় মঠের স্বামী অভয়ানন্দ (ভরত মহারাজ) স্বামী গম্ভীরানন্দ প্রমুখ বরেণ্য সন্ন্যাসীরা সেদিন দার্জিলিং আশ্রমে উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিবছর শিলিগুড়ি থেকে পুজোর প্রতিমা সহ অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ করা হয় দার্জিলিং রেল স্টেশনের ঠিক নীচে আর এন সিনহা রোডে অবস্থিত এই রামকৃষ্ণ বেদান্ত আশ্রমে। দার্জিলিং বন্ধের কারণে সে বছর মন্দির কর্তৃপক্ষ খুব সাধারণভাবে পটেই পুজো করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এক ভক্ত কোনো সংবাদ না জানিয়েই অস্থিরতার মধ্যে দার্জিলিংয়ে প্রতিমা ও পুজোর সব উপকরণ নিয়ে গিয়েছিলেন নিজের ইচ্ছায়। দার্জিলিং আশ্রমে ৪০ বছর ধরে সেবারত স্বামী সুশান্তানন্দ বলেন, ‘প্রতিবছর শিলিগুড়ি ও অন্যান্য আশ্রম থেকে সাধু ব্রহ্মচারীরা দুর্গাপুজোয় উপস্থিত হন। বন্ধ চলায় সে বছর অন্যান্য আশ্রম থেকে সাধু ব্রহ্মচারীরা সেখানে যেতে পারেননি। মন্দিরে শ্রীরামকৃষ্ণের সেবার সঙ্গে সঙ্গে মা দুর্গার পুজোও একা হাতেই সামলাতে হয়েছিল তাঁকে। বন্ধের মধ্যে আশ্রমে থাকা ঢাকের বাজনা শুনে প্রতি বছরের মত স্থানীয় নেপালি-গোর্খা ভক্তরা এসে উপস্থিত হয়েছিলেন মন্দিরে। সবাইকে খিচুড়ি প্রসাদ দেওয়া হয়েছিল।
এখনও শিলিগুড়ি থেকেই আসে প্রতিমা, নবপত্রিকা ও পুজোর সব সামগ্রী। কোভিডের সময় মুষ্টিমেয় আশ্রমিক আর স্থানীয় নেপলি মানুষ দুর্গার আরাধনা করেছিলেন শাস্ত্রীয় রীতিনীতি মেনে। দশমী পুজোর শেষে নদীতে বিসর্জনের বিধি থাকলেও এখানে প্রতিমা নিরঞ্জন হয় পাহাড়ি ঝরনার জলে। রামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠের বর্তমান সম্পাদক স্বামী আত্মবোধানন্দ বলেন, অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি হিমালয়ের কোলে শান্ত শিবভূমি দার্জিলিং বারবার রাজনৈতিক কারণে অশান্ত হলেও ১০১ বছরের এই আশ্রমে মা দুর্গা প্রতিবছর পুজো নিতে আসেন। তাই বহুরকম বাধার ভিতরেও দুর্গার পুজো বন্ধ হয়নি। জগতের কল্যাণে মা দুর্গার পুজো স্থানীয় পার্বত্যবাসীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র।



