প্রাচীনকালে মানুষ ছিল প্রকৃতির পূজারি। বন্যা, ঝড়, খরা, দাবানলের মতো বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচতে প্রকৃতির নানা উপাদানকে পূজা করত তারা। আজও বিশ্বের বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠী প্রকৃতি-পূজার সেই ধারা বহন করে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড সহ সমগ্র ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চল তো বটেই, উত্তরবঙ্গ, অসম, ওপার বাংলার সিলেট, চট্টগ্রামে ছড়িয়ে রয়েছে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী। তারা যে আজও প্রকৃতি পূজার চিরন্তন প্রবাহকে ধরে রেখেছে, ‘বাহা’ পরব তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ‘বাহা’ কথার অর্থ ফুল। শীতের বিদায়ে, বসন্তের আগমনে যখন পলাশ, মহুয়া, কৃষ্ণচূড়ার রঙে দিগন্ত রাঙা হয়ে ওঠে, তখন খুশির ঢেউ ওঠে সাঁওতাল পরগনায়। বসন্তের আগমনে প্রকৃতি যেভাবে রঙিন হয়ে ওঠে, তা যেন সারা বছর অক্ষুণ্ণ থাকে, সেই আশাতেই ‘বাহা’ পরব। সাঁওতালদের রীতি অনুযায়ী মাঘ হল বছরের শেষ মাস। বছরের প্রথম মাস অর্থাৎ ফাল্গুনে শুক্লপক্ষের দ্বাদশী তিথি থেকে শুরু হয় ‘বাহা’ উদযাপন। শেষ হয় বসন্ত পূর্ণিমা বা দোলের দিন। যতদিন না ‘বাহা’ সম্পন্ন হচ্ছে, ততদিন সাঁওতালরা কেউ মহুয়া ফুল খান না। পরবের ক’দিন আগে থেকে সেজে উঠতে শুরু করে প্রতিটি ঘরদোর। এই পরবে ‘বোঙ্গা’ অর্থাৎ সাঁওতালদের দেবীর পুজো করা হয়। যেখানে পুজো হয়, সেই জায়গাটিকে বলে ‘জাহের থান’। দুই অবিবাহিত পুরুষ শাল ও মহুয়া ফুল তুলে নিয়ে সেখানে আসে। সবাই জল নিয়ে যায় জাহের থানে। ‘মাঝি’ বা পুরোহিত পুজো করেন। পুজো শেষে শাল ফুল তুলে দেন সবার হাতে। সেই ফুলই খোঁপায় পরেন মহিলারা। পংক্তিভোজনে শামিল হন সকলে। এরপর শুরু হয় নাচ-গান। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। দূর থেকে ভেসে আসা মাদলের দ্রিমি দ্রিমি শুনে বেজে ওঠে ধামসা, বাঁশি। অন্ধকার যত ঘন হয়, নাচের ছন্দ, মাদলের বোল তত নিবিড় হয়। সারারাত চলে ‘বাহা এনেচ’, ‘বাহা সেরেঞ্চ’। উৎসবের শেষ দিনে সাঁওতাল পুরুষরা দল বেঁধে শিকারে যায়। হাঁড়িয়া আর মহুয়ার রস দিয়ে চলে অতিথি আপ্যায়ন। ‘বাহা’য় যেন প্রকৃতির কোলে নিজেদের বিলিয়ে দেয় প্রকৃতির সন্তানরা!



