ইতিহাসের বহু অধ্যায়ের সাক্ষী বরানগরের পাঠবাড়ি। চৈতন্য মহাপ্রভুর পদধূলিধন্য এই পাঠবাড়ি আশ্রমের অন্যতম দ্রষ্টব্য ইতিহাস প্রসিদ্ধ বকুল গাছ। আজও দেশ-বিদেশ থেকে আসা হাজার হাজার মানুষ এই পাঠবাড়ি আশ্রমে আসেন। পুজো দেওয়ার পাশাপাশি বাড়ি ও পরিবারের মঙ্গল কামনায় গাছটিতে এসে মাথা ছুঁইয়ে যান। অনেকে আবার এই বকুল গাছ থেকে পড়া বকুল ফুল পরম ভক্তিভরে তুলে নিয়ে যান। গাছের গোড়ায় থাকা মাটি তিলক হিসেবে কপালে ঠেকান কেউ কেউ। যদিও আশ্রমের ঐতিহাসিক এই বকুল গাছটি কবে রোপন করা হয়েছিল, তা নিয়ে অবশ্য নানা মতভেদ রয়েছে। শুধু বকুল গাছই নয়, রামদাস বাবাজি মহারাজ প্রতিষ্ঠিত এই পাঠবাড়ি আশ্রমে রয়েছে জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা, রাধা-কৃষ্ণ, নিমকাঠের তৈরি নিতাই-গৌরাঙ্গের বহু প্রাচীন মূর্তি। মন্দির প্রতিষ্ঠাতা রামদাস বাবাজি মহারাজের সমাধি মন্দিরও এখানকার বিশেষ আকর্ষণ। রয়েছে টোল, সংগ্ৰহশালা ও সুপ্রাচীন একটি ইঁদারা। বরানগর পাঠবাড়ি আশ্রমেরও ইতিহাস সুদীর্ঘ। সুপ্রাচীন এই ধর্মীয় পীঠস্থানকে কেন্দ্র করে চৈতন্যদেবের আগমন সম্পর্কে প্রয়াত আঞ্চলিক ইতিহাসবিদ অজিত সেনের ‘বরানগর আঞ্চলিক ইতিহাস’ ও প্রয়াত বৈদ্যনাথ হালদারের ‘বরণীয় নগরের চারপাশ’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে নানা ইতিবৃত্ত। ওই দুই গ্রন্থ থেকে জানা যায়, শ্রীরঘুনাথ উপাধ্যায় নামে এক পরম ভক্তের আকর্ষণে চৈতন্য মহাপ্রভু, বরানগরের মালীপাড়া (অধুনা শ্রীপাঠবাড়ি আশ্রম) অঞ্চলে শ্রীরঘুনাথের কুটিরে আসেন।১৫১১ খ্রিস্টাব্দে আম বারুণীর দিন ছিল সেই শুভাগমন তিথি। তিনি নৌকা করে বরানগরের গুহঘাটে পৌঁছান। পরবর্তীতে এই ঘাটটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় চৈতন্য ঘাট। বরানগরে পৌঁছে পরের তিনদিন মালিপাড়ায় ছিলেন চৈতন্যদেব। পরে নীলাচল অভিমুখে যাত্রাকালে নিজের পাদুকাযুগল শ্রীরঘুনাথকে দান করেন। অজিতবাবু তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন—‘বরানগর পাঠবাড়ি আশ্রম শুধুমাত্র বৈষ্ণব ভক্তগণের কাছেই নয়, সর্বশ্রেণীর ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছেই মহাতীর্থরূপে পরিগণিত হয়েছে।’ বৃন্দাবন দাস রচিত ‘শ্রীচৈতন্যভাগবত’ গ্রন্থেও উল্লেখ রয়েছে বরানগরে চৈতন্যদেবের আগমনের কথা। সেখানে উল্লেখ রয়েছে—‘তবে প্রভু আইলেন বরাহনগরে/ মহা ভাগ্যবন্ত এক ব্রাহ্মণের ঘরে/ সেই বিপ্র বড় সুশিক্ষিত ভাগবতে/ প্রভু দেখি ভগবত লাগিলা পড়িতে/ শুনিয়া তাহার ভক্তিযোগের পঠন/ আবিষ্টা হইলা গৌর চন্দ্র নারায়ণ।’



