বর্তমান আর বরুণ সেনগুপ্ত, এই দুটো নাম আলাদাভাবে উচ্চারিত হয় না। ৪০ বছর আগে শুরুর দিনে বর্তমান ছিল বরুণদার কাগজ। আজও তাই। খবরের কাগজ সমাজের আয়না। মানুষের মনের কথা দেখা যায় তার প্রতিটা অক্ষরে। বরুণদা সেটাই প্রমাণ করে গিয়েছেন। আজীবন। বর্তমান-এর শুরুর দিনে সিপিএম ছিল মধ্যগগনে। সবাই যখন তাদের আতঙ্কে কুঁকড়ে থাকত, মাথা তুলেছিলেন বরুণদা। দেখিয়েছিলেন, কেউ পাশে না থাকলেও সত্যিটা বলা যায়। এমন সাংবাদিক আজ সত্যিই বিরল। পথ চলতে চলতেই আলাপ তাঁর সঙ্গে। সুব্রতদার (সুব্রত মুখোপাধ্যায়) সঙ্গে প্রথমবার গিয়েছিলাম তাঁর কাছে। তারপর বেশ কয়েকবার গিয়েছি আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোডের জোড়াগির্জার পুরনো অফিসে। মনে আছে, তখন আমি প্রার্থী হয়েছি যাদবপুর কেন্দ্রে। ’৮৪ সালে। বিপক্ষে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। কেউ সাহস করেনি। আমি কিন্তু ডরাইনি। কী ছিল তখন আমার! প্রচারের জন্যও হাত পাততে হয়েছিল দরজায় দরজায়। রাজনীতির সেই পথচলায় বরুণদা তখন আমার কাছে দেখা দিয়েছিলেন পথপ্রদর্শক হয়ে। যে সাহায্যের হাত তিনি বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তার জন্য আমি আজও কৃতজ্ঞ। যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রে আমার লড়াইয়ের খবর ছবি দিয়ে প্রকাশ করেছিলেন। নতুনদের নিয়ে, তরুণদের নিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি বর্তমান... সেই কাগজ বেহালা, যাদবপুরে ঢুকতে দেয়নি সিপিএমের লোকেরা। তাও হাল ছাড়েননি বরুণদা। সেই ছিল শুরু। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সাধারণ ঘর থেকে উঠে আসা একজনও যে সিপিএমের ওই দাপটকে চ্যালেঞ্জ ছুড়তে পারে, দেখিয়ে দিয়েছিলেন বরুণদা। বছরের পর বছর পেরিয়েছে। লড়াইয়ের ওই পথ থেকে এতটুকুও টলে যাননি তিনি। আমাকেও বেসামাল হতে দেননি। সত্যের পক্ষে শুরু করা সেই ধর্মযুদ্ধে নির্ভীক নেতৃত্ব দিয়েছেন বরুণদা। সাহস অবশ্য তাঁর বরাবরই বেশি। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের আমল হোক, বা তারপর সিপিএমের অত্যাচার—কলমকে তরোয়ালের মতো ব্যবহার করেছেন। আনন্দমার্গী হত্যা, মরিচঝাঁপি, কিংবা বানতলায় অনিতা দেওয়ান ধর্ষণ-খুন... গর্জে উঠেছে তাঁর সংবাদপত্র। রাজনীতির শিক্ষার্থী হিসেবে পড়তাম তাঁর লেখা। আর রাজনীতির অলিন্দে পা রাখার পরও সেই শিক্ষায় ছেদ পড়েনি। আর অভিভাবকত্ব, ঘাটতি বোধ হয়নি কখনও।
Advertisement
’৯০ সালে মার খেয়েছি, বরুণদা সোজা চলে গিয়েছেন হাসপাতালে... আমাকে দেখতে। সাহস জুগিয়েছেন। বলেছেন, হাল ছেড়ো না। সেই কথাটাই মাথায় ঢুকে গিয়েছিল। তারপর এল ’৯৩ সালের সেই অভিশপ্ত ২১ জুলাই। পুলিসের বুলেটে আমাদের ১৩ জন কর্মী প্রাণ হারিয়েছিলেন সেদিন। আমাদের লড়াইয়ের সঙ্গী হয়েছিলেন তিনি। সব বাধা অতিক্রম করে। জ্বলে উঠেছিল বরুণদার কলম। মানুষ জেনেছিল অমানবিক সরকারের আসল রূপ। আমাকে বলেছিলেন, বিরোধীদের অবস্থা এখন অসহায়। ওরা আন্দোলন করতে দিচ্ছে না। কিন্তু নিহতদের পরিবারের পাশে তো দাঁড়াতে হবে। গুরুতর জখমদের সাহায্য করতে হবে। জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী করব বরুণদা? আপনিই বলুন। পরামর্শ দিয়েছিলেন, তুমি একটা ফান্ড তৈরি করো। মানুষের কাছে আবেদন করো। বাংলার মানুষ তোমার সঙ্গে আছে। প্রমাণ পেয়েছিলাম। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় সভাপতি, আর সাধারণ সম্পাদক প্রদ্যুৎ দত্তকে নিয়ে তৈরি হওয়া ফান্ডে উপচে পড়েছিল মানুষের আবেগ। প্রত্যেক পরিবারকে ১ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা করে সাহায্য করতে পেরেছিলাম আমরা। তার থেকেও বেঁচে যাওয়া ৪ লক্ষ টাকা দিয়েছিলাম গুজরাতের ভূমিকম্পে দুর্গতদের।
খবর রাখা, খবর নেওয়া এবং খবর করা। এভাবেই তো এগিয়েছেন বরুণদা। এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন বর্তমানকে। কাগজের সার্কুলেশন বাড়িয়েছেন। মর্যাদা দিয়েছেন যোগ্য সাংবাদিককে। মর্যাদা দিয়েছেন বাংলাকে। এই রাজ্যের মানুষকে। আজও তাই বরুণদা এবং বর্তমান—এই দু’টি নামের উপর আমাদের আস্থা অন্তরের। বর্তমান ৪০ বছর পূর্ণ করে ৪১’এ পা রাখছে। বরুণদার পথদিশাকে সামনে রেখে আজও এগিয়ে চলেছে বর্তমান। সেই আস্থা বজায় রেখে, বরুণদার শিক্ষায়, আশীর্বাদে। বাংলার সঙ্গে এসেছে হিন্দি বর্তমান পত্রিকাও। ওই এক নির্ভিকতাকে সঙ্গী করে। মাটির সঙ্গে যোগ রেখে। এই সবের জন্য অভিনন্দন প্রাপ্য তাদের। আর বরুণদার জন্য? সীমাহীন শ্রদ্ধা।
বরণীয় বরুণদা। তিনি সময়ের সঙ্গে, সময়ের আগে... চিরকালীন। তিনি সর্বজনের... সর্বজনীন। সংবাদপত্র জগতের নায়ক। বরুণদা মহীরুহ। তার ছায়া শিক্ষা হয়ে থাকবে আমাদের মাথার উপর। সর্বদা।
খবর রাখা, খবর নেওয়া এবং খবর করা। এভাবেই তো এগিয়েছেন বরুণদা। এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন বর্তমানকে। কাগজের সার্কুলেশন বাড়িয়েছেন। মর্যাদা দিয়েছেন যোগ্য সাংবাদিককে। মর্যাদা দিয়েছেন বাংলাকে। এই রাজ্যের মানুষকে। আজও তাই বরুণদা এবং বর্তমান—এই দু’টি নামের উপর আমাদের আস্থা অন্তরের। বর্তমান ৪০ বছর পূর্ণ করে ৪১’এ পা রাখছে। বরুণদার পথদিশাকে সামনে রেখে আজও এগিয়ে চলেছে বর্তমান। সেই আস্থা বজায় রেখে, বরুণদার শিক্ষায়, আশীর্বাদে। বাংলার সঙ্গে এসেছে হিন্দি বর্তমান পত্রিকাও। ওই এক নির্ভিকতাকে সঙ্গী করে। মাটির সঙ্গে যোগ রেখে। এই সবের জন্য অভিনন্দন প্রাপ্য তাদের। আর বরুণদার জন্য? সীমাহীন শ্রদ্ধা।
বরণীয় বরুণদা। তিনি সময়ের সঙ্গে, সময়ের আগে... চিরকালীন। তিনি সর্বজনের... সর্বজনীন। সংবাদপত্র জগতের নায়ক। বরুণদা মহীরুহ। তার ছায়া শিক্ষা হয়ে থাকবে আমাদের মাথার উপর। সর্বদা।



