Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

বন্দুকের নলে সমাজ বদল হয় না, বদলায় শিক্ষায়, স্কুলে পাঠ দিচ্ছেন মাওবাদী লিঙ্কম্যান দম্পতি

বন্দুকের নলে সমাজ বদল হয় না, বদলায় শিক্ষায়, স্কুলে পাঠ দিচ্ছেন মাওবাদী লিঙ্কম্যান দম্পতি
  • ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
পিনাকী ধোলে, বরাবাজার (পুরুলিয়া): একদা সমাজের বদলের স্বপ্ন দেখে মাওবাদী আদর্শে মজে যাওয়া ওঁদের। মাওবাদীদের নীতি-আদর্শ প্রচারে গোপনে সভা-সমিতি। দুয়ারে দুয়ারে ছুটে বেড়ানো। জঙ্গলমহলের গরিব মানুষের মগজধোলাই—সবই ওঁদের করতে হতো রুটিন মাফিক। মুখে বলে বেড়াতেন, ‘বাঁচতে হলে লড়তে হবে। বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস।’ স্বপ্ন দেখাতেন, পুঁজিবাদী সমাজকে ছুড়ে ফেলতে হবে। গড়তে হবে শ্রেণিহীন সাম্য-সমাজ।  তাতে কাজও হয়েছিল। দ্রুত বিস্তারলাভ করেছিল মাওবাদীরা। স্বভাবতই ওঁরাই হয়ে উঠেছিলেন ‘বিপ্লবী’ আদর্শ প্রচারে পরিচিত মুখ। পুলিসের কথায় মাওবাদীদের লিঙ্কম্যান। এখন সেই মুখে ওঁরা বলছেন, ‘রক্ত ঝরালে সমাজ বদলায় না। বদল হয় শিক্ষার আলোয়।’ দস্তুরমতো নিজেদের বাড়িতে পাঠাশালা খুলে পাঠ দিচ্ছেন নতুন প্রজন্মকে। বন্দুকের নলে ওঁরা আর ক্ষমতার উৎস খোঁজে না। খুঁজতে চায়ও না। 
Advertisement
ওঁরা বলতে বিশ্বনাথ মাঝি ও গান্ধারি মাঝি। দু’জনেই স্বামী-স্ত্রী। মাওবাদীদের লিঙ্কম্যান হয়ে বহু রক্তপাতের সাক্ষী এই দম্পতি। এখনও চোখ বুঝলে দেখতে পান তেতে ওঠা জঙ্গলমহলকে। নিশ্বাসে গন্ধ পান বারুদের। শুনতে পান বোমা-গুলির আওয়াজ আর মানুষের হাহাকার। মনে মনে হয়তো ভাবেন, কী ভুলটাই না করেছিলাম। এতকিছু করেও তো  সমাজের বদল হল না! একদিন মাওবাদী সম্পর্কে মোহভঙ্গ হল বিশ্বনাথ-গান্ধারির। লিঙ্কম্যান থেকে দু’জনেই হয়ে ওঠলেন পুলিসের সোর্স। তার পর বাংলায় পালাবদল। মাওবাদীদের পুনর্বাসন প্যাকেজ ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। বিশ্বনাথ-গান্ধারিকে ‘পুরস্কার’ পুলিসের। এখন ওই পাঠশালায় পড়ানোর দায়িত্ব দু’জনের।
পুরুলিয়ার বরাবাজার থানার বেড়াদা অঞ্চলের প্রান্ত গ্রাম ভিখারি চেলিয়াম। কিছু দূরে ঝাড়খন্ড সীমানা। খুব বেশি দূরে নয় দলমা পাহাড়। বছর বারো আগেও এই এলাকায় ত্রাস ছিল মাওবাদীদের ‘দলমা স্কোয়াড’। নামেই কাঁপত গোটা জঙ্গলমহল। ২০০৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর। এই বেড়াদাতেই যাত্রার অনুষ্ঠানে গেরিলা কায়দায় হামলা চালায় স্কোয়াডের সদস্যরা। দুই কনস্টেবল-সহ তিন জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। সেই সময়ই ঝাড়খন্ডের এক আত্মীয়ের সূত্র ধরে মাওবাদীদের সংস্রবে আসা বিশ্বনাথের।  স্মৃতিচারণে বিশ্বনাথ বলছিলেন, ‘গ্রামে অনুন্নয়ন, সিপিএম নেতাদের অত্যাচার, বামেদের পুলিসি দমন-পীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন এলাকার বাসিন্দারা। আমাদের দুঃখ ঘুঁচিয়ে সুদিনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল মাওবাদীরা। তাই ওদের কাজকর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ি।’
সেই শুরু। সমাজ বদলের স্বপ্নে বিভোর হয়ে নিজের এলাকায় মাওবাদী মতাদর্শ প্রচার করতে থাকেন বিশ্বনাথ। সঙ্গে স্ত্রী গান্ধারী। আক্ষেপ করে বিশ্বনাথ বলছিলেন, ‘সময় যত গড়িয়েছে, ওদের সম্পর্কে ধারণা বদলেছে। পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছিল মাওবাদীরা। পরে ওরাই নির্মম অত্যাচার শুরু করে সাধারণের উপর। ওরা পুলিসকে মারতে চাইত। মারা পড়তেন ছাপোষা গ্রামবাসীরা। গরীব মানুষ গোরু, ছাগল বিক্রি করলেও সেই টাকায় ভাগ বসাত। চোখের সামনে এসব দেখে মাওবাদী আদর্শের প্রতি মোহভঙ্গ ঘটে। তখনই ভাবি, কৌশলে মাওবাদীদের দমন করতেই হবে। গোপনে সেই চেষ্টাই করতে থাকি।’ অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মাওবাদীদের লিঙ্কম্যান বিশ্বনাথ-গান্ধারি হয়ে ওঠেন পুলিসের নির্ভরযোগ্য সোর্স। 
পালাবদলের পর দু’জনকেই নিয়ে আসা হয় পুনর্বাসন প্যাকেজের আওতায়। ‘স্পেশাল পুলিস অফিসার’ হিসেবে দম্পতিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। এখন জঙ্গলমহলে জ্বালাছেন শিক্ষার আলো। নিজেদের বাড়িতেই খুলেছেন পাঠশালা। সেখানেই প্রথম প্রজন্মের ৪০টি আদিবাসী শিশু পড়াশোনা করছে। বন্দুকের নলে হিংসা ছড়ানো ছাড়া কিচ্ছুটি হয় না—বোঝাচ্ছেন ‘নিজেদের সিলেবাসে’।
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ