‘শিব-শিবা বন্দি গাই ফুলেশ্বরী নদী।/ যার জলে তৃষ্ণা দূর করি নিরবধি।।/ বিধিমতে প্রণাম করি সকলের পায়।/ পিতার আদেশে চন্দ্রা রামায়ণ গায়।।’
একদিকে পাটোয়ারি। অন্যদিকে সুন্ধা। দুই গ্রামের মাঝখানে ফুলেশ্বরী নদী। বনে বনে পুজোর ফুল তুলতে বেরত পাটোয়ারির চন্দ্রা। আসত সুন্ধার জয়। পিতৃমাতৃহীন জয় থাকত মামার বাড়িতে। ফুল তুলতে তুলতে খেলা আর গল্প। তারপর প্রেমের বিনিসুতোর মালায় বাঁধা পড়ে দু’টি কিশোর মন। এরমধ্যে বাবার নেশা পেয়ে বসে চন্দ্রাকে। সে কবিতা লিখতে শুরু করে। আর জয় হয়ে ওঠে শাস্ত্রবিদ। দু’জনের বিয়ের দিনও ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু আচমকাই যেন চন্দ্রার জীবনে নেমে আসে দুর্যোগের দুর্বিপাক। মতিভ্রম হয় জয়ের। সে বিয়ে করে বসে স্থানীয় কাজীর কন্যাকে। এই খবর জানতে পেরে শোকে পাথর হয়ে যায় চন্দ্রা। বিরহে কাতর চন্দ্রা সারাজীবন অবিবাহিত থেকে শিবসাধনার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর বাবা ফুলেশ্বরীর তীরে মেয়ের জন্য গড়ে দেন শিবমন্দির। সেখানেই পুজো আর সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করে সে। বাবার অনুমতি নিয়ে হাত দেয় রামায়ণ লেখার কাজে। এর মধ্যে একদিন ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসে জয়। তার ডাক কানে যায়নি চন্দ্রার। ফুলেশ্বরীর জলে জয়ের নিথর দেহ ভেসে উঠতে দেখা যায়। এই শোকে চন্দ্রাও অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। অসমাপ্ত থেকে যায় তাঁর রামায়ণ লেখার কাজ।
এই চন্দ্রা হলেন কবি চন্দ্রাবতী। অধুনা বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলায় ছিল তাঁর বাড়ি। সেদিনের ফুলেশ্বরী নদী এখন ফুলিয়া নামে পরিচিত। মনসামঙ্গল কাব্যের অন্যতম রচয়িতা বংশীদাস ভট্টাচার্য ওরফে দ্বিজ বংশীদাস তাঁর বাবা। মা সুলোচনা দেবী ওরফে অঞ্জনা। গবেষকদের অনেকেই তাঁকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যের সূচনা হয়েছিল সপ্তম-অষ্টম খ্রিস্টাব্দ থেকেই। কিন্তু ষোড়শ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সেই অর্থে কোনও মহিলা কবি ছিলেন না। চন্দ্রাবতীর জন্ম ১৫৫০ সালে। মৃত্যু ১৬০০ খ্রিস্টাব্দ। এই সময়কালেই তিনি লিখেছেন মালুয়া গীতিকাব্য, দস্যু কেনারামের পালা ও রামায়ণ (অসমাপ্ত)।