Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

‘পিষে মারতে চায় বিজেপি’, খ্রিস্টানপাড়ায় এককাট্টা খ্রিস্টানরা

গ্রাহাম স্টেইনস ও তাঁর নাবালক পুত্রদের হত্যার ঘটনা স্মৃতিতে এখনও টাটকা। মেরুদণ্ডে ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দেয় কেষ্টপুরের খ্রিস্টানপাড়ার।

‘পিষে মারতে চায় বিজেপি’, খ্রিস্টানপাড়ায় এককাট্টা খ্রিস্টানরা
  • ২০ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: গ্রাহাম স্টেইনস ও তাঁর নাবালক পুত্রদের হত্যার ঘটনা স্মৃতিতে এখনও টাটকা। মেরুদণ্ডে ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দেয় কেষ্টপুরের খ্রিস্টানপাড়ার। চেতনে-অবচেতনে ফিরে ফিরে আসে বজরং দল, গেরুয়া বাহিনী, আগুনে সেই দৃশ্য।এখানকার মানুষ এখনও তাই বলেন, ‘উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা ক্ষমতায় এলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের পিষে মারবে। স্টেইনসের মতো জীবন্ত পুড়িয়ে মারবে বজরং দলের দারা সিংয়ের মতো কোনো এক উগ্র হিন্দুত্ববাদী। অস্তিত্ব বিপন্ন হবে এই অঞ্চলের প্রায় ৮০০০ খ্রিস্টানের।’ সুকান্তপল্লির যুবক সৌরভ বর পেশায় বিদ্যুৎকর্মী। তিনি বলেন, ‘সংখ্যালঘুদের দেশ থেকে তাড়াতে চায় বিজেপি। খ্রিস্টানরা ওদের বিরুদ্ধে এককাট্টা।’ সৌরভ একা নন এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দার মুখে একই কথা। পাড়াটাই খ্রিস্টান প্রভাবিত। আর বিধানসভা কেন্দ্র? দু’টি। রাজারহাট-গোপালপুর এবং রাজারহাট-নিউটাউন। জেনেছেন তাঁরা... প্রার্থী দিয়েছে বিজেপি। আর খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের হাজার হাজার তখনই এককাট্টা হয়ে গিয়েছে—বিজেপিকে একটি ভোটও নয়। 

Advertisement

এলাকার গুরুত্বপূর্ণ গির্জা হল ইমানুয়েল চার্চ। ফাদার শান্তনু গায়েন। বলছিলেন, ‘চার্চ কখনও রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার করে না। আমরা শান্তির পক্ষে। ধর্মীয় হানাহানির বিপক্ষে। ধর্মকে হাতিয়ার করে মানুষকে ভুল বুঝিয়ে যে রাজনীতি বর্তমানে চলছে, খ্রিস্টধর্ম কঠোরভাবে তার বিরোধিতা করে। খ্রিস্টানরা মানুষের মধ্যে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতেই কাজ করে চলে নিরন্তর।’ 
খ্রিস্টানপাড়া জায়গাটা মিশনবাজার নামেও পরিচিত। সবমিলিয়ে এই দুই বিধানসভা এবং আশপাশের বেশ কয়েকটি অঞ্চল মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। এলাকাটি বহু প্রাচীন। ইমানুয়েল চার্চ স্থাপিত হয় ১৮২৯ সালে। সল্টলেকের সংযোজিত এলাকা নয়াপট্টির পাশে কেষ্টপুর খাল। তার ঠিক ওপারেই খ্রিস্টানপাড়া। কেষ্টপুরে ভিআইপি রোড দিয়ে ঢুকে আড়াই কিলোমিটারের মতো। আর নিউটাউন থেকে দূরত্ব দেড় কিমি। দু’পাশের এলাকা হিন্দু প্রভাবিত। তার মাঝে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের বসবাসের জায়গাটি হল খ্রিস্টানপাড়া। হিন্দুদের পাশাপাশি।
কলকাতায় দু’শো বছরের চার্চ সংখ্যায় খুব একটা বেশি নেই। সেই দিক থেকে দেখলে ইমানুয়েল চার্চটি ঐতিহাসিক। ২০০ বছর আগে প্রায় জনশূন্য একটি জঙ্গল ঘেরা জনপদে কতিপয় মানুষ ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান হলেন, চার্চ তৈরি হল। চার্চ তৈরির কাহিনি গির্জার ভিতরে কাঠের ফলকে খোদাই করা আছে। ১৮০৬ সালের মধ্য এপ্রিলে কোনো এক দুপুরে প্রচণ্ড তীব্র কালবৈশাখীর ঝড় চাবুকের মতো আছড়ে পড়ে সুন্দরবন লাগোয়া বঙ্গোপসাগরের উপকূলে। ৪৭টি বাণিজ্য তরী সেই ভয়ংকর ঝড়ে আটকে পড়ে। পাঁচটি কোনোক্রমে রক্ষা পায়। বিদ্যাধরী নদীর কূলে এসে ঠেকে সেগুলি। তরীর মানুষরা হল্যান্ড, পর্তুগাল এবং ইংরেজ বণিকদের অধীনস্থ কর্মচারী। অঞ্চলটি তখন বন্যপ্রাণীতে ভর্তি। দুর্ঘটনাগ্রস্ত নৌকার রক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বাঁশ-কাঠ আর নারকেল গাছের পাতা দিয়ে অস্থায়ী ছাউনি তৈরি করেন। আগুন জ্বেলে সারারাত কাটান। পরের দিন স্থানীয় কিছু বাসিন্দা তাঁদের উদ্ধার করেন। সেই ইউরোপীয়রা থাকতে শুরু করেন এখানে। তখন নারপীত সিং নামে ১৮ বছরের এক স্থানীয় যুবক ক্যাথরিন নামে ১৪ বছরের এক পর্তুগিজ মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট হন। দু’জনের ভালোবাসার সম্পর্ক হয়। তবে স্থানীয়দের বিরোধিতার কারণে বারাণসী পালিয়ে যান তাঁরা। ১৮১৮ সালে ওই যুগল আবার ফিরে আসেন কৃষ্ণপুরে। তারপর শুরু করেন সাধারণ মানুষের মধ্যে সুসমাচার প্রচার। একটি চ্যাপেল স্থাপন করেন তাঁরা। প্রতিষ্ঠা করেন ইমানুয়েল মণ্ডলী। তারপর চার্চ গঠন হয় ১৮২৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। ধীরে এই অঞ্চলের বহু মানুষ ধর্মান্তরিত হন। গির্জাকে কেন্দ্র করে বসবাস শুরু করেন। গির্জাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার প্রসার ঘটে। বুনিয়াদি পঠনপাঠন শুরু হয়। 
প্রায় দু’শো বছর ধরে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ কেষ্টপুরের এই অঞ্চলে বংশপরম্পরায় বসবাস করছেন। তাঁদের প্রায় কেউই স্টেইনসকে ভোলেননি। তাঁকে দুই নাবালক পুত্র সহ জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনা খ্রিস্টানপাড়াকে এখনও শিহরিত করে।  নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ