সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: ১৯১৮ সালের ১১ মার্চ। স্যার রাজেন্দ্র মুখোপাধ্যায় বার্নপুরে গড়ে তোলেন ইস্কো। শতাব্দীপ্রাচীন এই কারখানার গৌরবগাঁথায় এই প্রথম স্বীকৃত ইউনিয়ন নির্বাচনের ভোট হতে চলেছে ২৪ সেপ্টেম্বর। সেই নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনার ফুটছে ইস্পত শহর বার্নপুর। বিজেপি সরকার গঠনের পর শিল্পাঞ্চলের প্রথম বৃহৎ শ্রমিক ইউনিয়ন নির্বাচন নিজেদের মর্যাদার লড়াই গেরুয়া শিবিরের কাছে। ৪০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে সম্প্রসারণ ও আধুনিকীরণ হতে চলা কারখানার রাশ ধরে রাখতে এই নির্বাচনে জয় আবশ্যিকও। কর্মসংস্থানের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে নির্বাচনে ব্যাপক প্রচারে নেমেছে বিএমএস। জানা গিয়েছে, শ্রমিক সংগঠনকে জিততে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়েছে বিজেপিও।
এই অবস্থায় গুরুতর অভিযোগ তুলল বিরোধীরা। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন কেন্দ্রীয় ডেপুটি লেবার কমিশনার ও কয়েকজন আধিকারিক। আইএনটিইউসি, সিটুর মতো বিজেপি বিরোধী শ্রমিক সংগঠন গুলির অভিযোগ, নির্বাচনের জন্য আদর্শ আচারণ বিধি চালু হয়েছে। তারপরও বিশেষ একটি সংগঠনের সঙ্গে বৈঠকে বসে শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি মেনে নেওয়া হচ্ছে। এতে ঘুরিয়ে শ্রমিকদের প্রভাবিত করতে সুবিধা করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে বাকি শ্রমিক সংগঠন ও তাঁদের নেতৃত্বরা। অন্যদিকে, অনেকে অভিযোগ তুলছে রাজ্যে ক্ষমতায় থাকার সুযোগে বিভিন্ন বিরোধী সংগঠনের নেতাদের উপর চাপ সৃষ্টি শুরু করেছে বিজেপি।
সাধারণ শ্রমিক সংগঠনের স্বীকৃতি নির্বাচন নিয়ে কেন এত উত্তেজনা? জানা গিয়েছে, এই নির্বাচনে কোনো শ্রমিক সংগঠন যদি ৫১ শতাংশ শ্রমিককের ভোট পেয়ে যায়, তাহলে কারখানা কর্তৃপক্ষ সেই শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গেই বৈঠক করবে। বাকি সংগঠনগুলির গুরুত্ব তখন তলানিতে ঠেকবে। কারখানায় হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে। ব্যাপক সংখ্যক শ্রমিক নিয়োগেরও সম্ভবনা রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সম মনোভাবাপন্ন বিএমএস এই নির্বাচনে জয়লাভ করলে আখেরে লাভ বিজেপিরই। নতুনদের চাকরি দেওয়া থেকে ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতেও বিজেপি পথে কোনো কাঁটা থাকবে না। তাই নির্বাচনে বিএমএসের জয় চেয়ে সচেষ্ট তারা। এছাড়াও এই এলাকারটি আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভা এলাকরা অর্ন্তগত। বিধায়ক রাজ্যের পুরমন্ত্রী তথা বিজেপির দাপুটে নেত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। পাশের বিধানসভার বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়। দু’জনেই হাতের তালুর মতো চেনে ইস্কোকে। এই অবস্থাতেই গেরুয়াদের আধিপত্য না থাকলে বিজেপি মর্যাদায় আঘাত লাগবে। তাই এই অতি তৎপরতা। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ বিরোধী শ্রমিক সংগঠনগুলি। আইএনটিইউসির শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি হরজিৎ সিং বলেন, ‘এই নির্বাচন জিততে সব নিয়ম ভাঙা হচ্ছে। কারখানার কর্মীদের শনিবারের হাফ ডে বন্ধ করা হোক বা ঠিকা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি না দেওয়ার ইস্যু হোক, আমরা প্রথম কেন্দ্রীয় লেবার কমিশনের নজরে এনেছি। অথচ, তাঁরা বিএমএসের সঙ্গে বৈঠক করে দাবি মানছে। বিএমএস ভোটের মুখে দাবি করছে, শ্রমিকদের হয়ে লড়াই করে সাফল্য আনছে।’ সিটু নেতা সৌরেন চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ডেপুটি কমিশনের অফিস বিএমএসের প্রতি সহানুভূতিশীল। প্রাক্তন শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটক বলেন, ‘বিভিন্ন পদক্ষেপ থেকে স্পষ্ট হচ্ছে নিরপেক্ষ ভোট হওয়ার কঠিন।’ এদিকে, বিএমএসের কারখানার সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘একশো ৮ বছর পর ইস্কোতে নির্বাচন হচ্ছে বিএমএস আদালতে যাওয়ার জন্য। এদিন শ্রমিক ভোটে না জিতেও কেউ কেউ রাজা হয়ে বসেছিলেন। আমরা চাইছি, শ্রমিকদের ভোটেই রাজা নির্বাচিত হোক। তাই আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে।’