


সোমনাথ বসু, কলকাতা: মুঠোফোনের ওপার থেকে ভেসে এল ভ্রাতৃহারা কণ্ঠ, ‘বড় ম্যাচই কেড়ে নিয়েছে আদ্যন্ত মোহন বাগানি মদনকে। ১৯৮০’র ১৬ আগস্ট জীবনে ভুলব না। তা সত্ত্বেও বলব, মোহন বাগান-ইস্ট বেঙ্গল ম্যাচ বাঙালির প্রাণ। এছাড়া আমরা অসম্পূর্ণ...’। আরও কিছু বলতে চাইছিলেন হরিমোহন বাগলি। কিন্তু পারলেন না। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।
ঠিকই বলেছেন হরিমোহন বাবু। মর্যাদার এই ম্যাচ ঘিরে চিরন্তন আবেগই বাঙালির ইউএসপি। রবিবার সন্ধ্যায় যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ডুরান্ড কাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে মুখোমুখি মোহন বাগান-ইস্ট বেঙ্গল। রাত জেগে টিকিটের লাইন, অনুশীলনে সমর্থকদের উৎসাহ, দুই কোচের মগজাস্ত্রে শান, চনমনে ফুটবলাররাই এই ম্যাচকে বছরের পর বছর ধরে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। ডুরান্ড ডার্বিও তার ব্যতিক্রম নয়। বরং গত কয়েকটি বড় ম্যাচের থেকে এর উত্তাপ অনেকটাই বেশি। তার প্রধান কারণ, ইস্ট বেঙ্গলের শক্তিশালী দল এবং পারফরম্যান্স।
ভারতীয় ফুটবলে সবচেয়ে বিগ বাজেটের দল মোহন বাগান। দল গড়তে কার্পণ্য করেন না সবুজ-মেরুন কর্ণধার। তাই পালতোলা নৌকা তো তরতরিয়ে এগবেই। কিন্তু এবার অতীতের ভুল শুধরে পরিকল্পিত দল গঠন করেছে ইস্ট বেঙ্গল। ডুরান্ড কাপের গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচই জিতেছে অস্কারের দল। গোল পেয়েছে ১২টি। হজম মাত্র একটি। শুধু তাই নয়, মিগুয়েল-হামিদ-সাউলরা দারুণ খেলছেন। রক্ষণ আরও জমাট করতে পারলে রবিবারের ডার্বি জমিয়ে দেবে ইস্ট বেঙ্গল। এটাও ঠিক, গ্রুপ পর্বে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হয়নি জ্বলন্ত মশালকে। তবে ছেলেদের মধ্যে লড়াইয়ের মন্ত্র ঢুকিয়ে দিতে পেরেছেন স্প্যানিশ কোচ। তাই পিতৃবিয়োগ হওয়ায় রশিদ আমেরিকায় ফিরলেও বাকিদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সদর্পে বলতে চাইছে, কুছ পরোয়া নেহি। বিপক্ষের চোখে চোখ রেখে লড়তে তৈরি লাল-হলুদ ব্রিগেড।
চলতি মরশুমে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর থেকে আগে অনুশীলন শুরু করেছে ইস্ট বেঙ্গল। ফুটবলারদের মধ্যে বোঝাপড়া মন্দ নয়। শুধু প্রয়োজন দুই উইং ব্যাক রাকিপ এবং লালচুংনুঙ্গার অটুট থাকা। কারণ, লিস্টন কোলাসো ও নবাগত পাসাং দর্জি তামাংয়ের গতিই এই ম্যাচে মোহন বাগানের অস্ত্র। তবে পাল্টা দিতে তৈরি অস্কারও। বাঁ দিক থেকে বিপিন সিংকে দৌড় করিয়ে তিনিও বিপক্ষ রক্ষণে ভাঙন ধরাতে চাইবেন। তাই রবিবারের ম্যাচে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সেন্ট্রাল মিডিওদের ভূমিকা। ইস্ট বেঙ্গলের সাউল ক্রেসপো এবং মহেশ যথেষ্ট অভিজ্ঞ। ব্রাজিলিয়ান মিগুয়েল ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছেন। তিনিই এই দলের ফুসফুস। আর গোলের জন্য রয়েছেন হামিদ।
তাহলে কি মোহন বাগান এই ম্যাচে পিছিয়ে? কখনওই নয়। বছর তিনেক ধরে সেট টিম ধরে রাখাই পালতোলা নৌকার আসল শক্তি। তাছাড়া জেমি ম্যাকলারেন, জেসন কামিংসদের মতো ম্যাচ উইনার তো রয়েইছেন। রক্ষণ জমাট রাখতে তৈরি টম আলড্রেড এবং আলবার্তো। মাঝমাঠে আপুইয়া এবং অনিরুদ্ধ থাপার উপর নির্ভর করছে ম্যাচের ভাগ্য। শুধু আশিস রাই ও তামাংয়ের বোঝাপড়া ঠিক রাখতে হবে। প্রতিযোগিতার প্রথম তিনটি ম্যাচ সহজে জিতেছে মোহন বাগান। কিন্তু ইস্ট বেঙ্গলের মতো তারাও তেমন পরীক্ষিত নয়। সবচেয়ে বড় কথা, হোসে মোলিনা এখনও পর্যন্ত ডার্বিতে অপরাজিত। পক্ষান্তরে, অস্কার এখনও এই ম্যাচ জেতেননি। কিন্তু কে বলতে পারে, রবিবারই এই পরিসংখ্যান বদলে যাবে না?
স্মৃতির ক্যানভাসে ভেসে উঠছে, ২০০৭’এর ১৭ আগস্ট। বড় ম্যাচের প্রথমার্ধে তিন গোলে এগিয়ে কার্লোস পেরেরার মোহন বাগান। কিন্তু বিরতির পর সুব্রত ভট্টাচার্যের ইস্ট বেঙ্গল ঘুরে দাঁড়ায়। ৩-৪ গোলে হারলেও আলভিটোদের পারফরম্যান্স এখনও চোখে লেগে আছে। আজ আবার সেই দিন কী হবে? অপেক্ষা আর কয়েক ঘণ্টার।
মোহন বাগানের সম্ভাব্য একাদশ: বিশাল, আশিস, আলবার্তো, আলড্রেড, অভিষেক, অনিরুদ্ধ, আপুইয়া, তামাং, সাহাল, লিস্টন ও ম্যাকলারেন।
ইস্ট বেঙ্গলের সম্ভাব্য একাদশ: গিল, রাকিপ, আনোয়ার, সিবলে, লালচুংনুঙ্গা, বিপিন, সাউল, মিগুয়েল, মহেশ, এডমুন্ড ও হামিদ।
যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে খেলা শুরু সন্ধ্যা সাতটায়। সোনি স্পোর্টসে সরাসরি সম্প্রচার।