শিশির ঘোষ: বিশ্বকাপের শুরুটা হয়েছিল তারকার জয়ধ্বনিতে। কিন্তু এই স্পেন বোঝাল, দলগত সংহতিই শেষ কথা। রক্ষণ থেকে আপফ্রন্ট— সব বিভাগের ফুটবলাররা জ্যামিতিক আকারে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াল। তাদের এই পাসিং ফুটবলের সামনেই বশ মানল তিনবারের চ্যাম্পিয়নরা। বলতে দ্বিধা নেই, যোগ্য দল হিসেবেই কাপ ঘরে তুলল স্প্যানিশ আর্মাডা। আর অতিরিক্ত মেসি নির্ভরতাই ফাইনালে ডোবাল আর্জেন্তিনাকে। স্কালোনির এই দলে দ্বিতীয় কোনো ফুটবলার নেই যে খেলা তৈরি করতে পারে।
আর্জেন্তিনার ভরাডুবির ময়নাতদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে একাধিক কারণ। সবার প্রথমে মেসির আটকে যাওয়া। পরিসংখ্যান বলছে, ফাইনালে ১২০ মিনিটে মাত্র ৫৪ বার বলে টাচ করেছে লিও। প্রথম ২০ মিনিটে সেই সংখ্যাটা ছিল মাত্র ১। আসলে স্পেন কোচ ফুয়েন্তে জানতেন, মেসিকে বক্সের সামনে বল ধরতে দিলেই বিপদ। তাই জোনাল মার্কিংয়ে সাপ্লাই লাইনটাই কেটে দিয়েছিলেন স্প্যানিশ কোচ। দলের রক্ষণ আর মাঝমাঠের বোঝাপড়া এতটাই মসৃণ ছিল যে, গোটা ম্যাচে একটি শটও তিনকাঠিতে রাখতে পারেনি আর্জেন্তিনা। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে একের পর এক মিস পাস, বল পজেশন ধরে রাখতে না পারা, রক্ষণের দুই ভরসা লিসান্ড্রো মার্তিনেজ ও ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর চোট আর অবশ্যই এনজো ফার্নান্ডেজের লাল কার্ড। অতিরিক্ত সময়ে আনুপাতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ কাজে লাগিয়েই কাঙ্ক্ষিত গোল তুলে নিল ফেরান তোরেস।
চলতি টুর্নামেন্টে বেশ নড়বড়ে দেখিয়েছিল আর্জেন্তিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে। কাতারের পারফরম্যান্সের সঙ্গে ছিল আকাশ পাতাল পার্থক্য। তা সত্ত্বেও ফাইনালে কিন্তু ওর দস্তানাই আর্জেন্তিনাকে লড়াইয়ে রেখেছিল। একের পর এক দুরন্ত সেভে বিশ্বব্যাপী অনুরাগীদের আশা বাঁচিয়ে রাখে। তবে স্পেনের গোলের ক্ষেত্রে ওর ওভাবে কমিট করা উচিত হয়নি। জিরো ডিগ্রি অ্যাঙ্গেল থেকে গোল করার দক্ষতা খুব কম ফুটবলারের রয়েছে। বক্সের ওই জায়গায় নিকো উইলিয়ামসের মাইনাস করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। তাই ডিবু জায়গায় থাকলে হয়তো শটটা আটকাতেও পারত। যাই হোক, আর্জেন্তিনার দুর্বলতা দিয়ে স্পেনের কৃতিত্বকে খাটো করা উচিতনয়।
লা রোহা ব্রিগেডের দ্বিতীয় বিশ্বজয়ের মূল কাণ্ডারি অবশ্যই কোচ লুই ডে লা ফুয়েন্তে। তাঁর ক্ষুরধার ফুটবল মস্তিস্কে ভর করেই একের পর এক হার্ডেল সহজেই টপকাল রড্রিরা। এবারের স্পেনের খেলায় ছিল না জাভি-ইনিয়েস্তাদের সেই ক্লাসিক, ধীরগতির পাসের বৃত্ত। বরং পাসের মসৃণতার সঙ্গে মিশে ছিল অবিশ্বাস্য গতি আর দ্রুত বল দখল নেওয়ার দক্ষতা। এই জায়গায় তাদের এই সাফল্যের নেপথ্যে ক্লাব ফুটবলের অবদান অনস্বীকার্য। বার্সেলোনার একঝাঁক ফুটবলারকে রেখে দল সাজিয়েছিলেন ফুয়েন্তে। কুবার্সি, পেড্রি, ইয়ামাল, ওলমো, তোরেসরা গত কয়েক বছরে ক্লাবের জার্সিতে যে ফুটবলটা খেলেছে, দেশের হয়ে ফুয়েন্তে সেটাই কাজে লাগালেন।