নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: শরতের আকাশে-বাতাসে এখন উৎসবের আমেজ। অন্যান্য জায়গায় মহালয়ার পর পুজোর প্রস্তুতি চূড়ান্ত রূপ নিলেও বীরভূমের দুবরাজপুর ব্লকের বালিজুড়ি গ্রামে দুর্গাপুজোর ঢাকে কাঠি পড়ে গেল। বহু বছরের প্রাচীন প্রথা ও নির্ঘণ্ট মেনে কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথিতেই শুরু হয়ে গেল এই গ্রামের ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো। রবিবার সকালে গ্রামের রায়, মুখোপাধ্যায় ও চট্টোপাধ্যায় পরিবারের সদস্যরা নির্দিষ্ট রীতি মেনে বোধন ও মঙ্গলঘট স্থাপনের মাধ্যমে দেবী দুর্গার আরাধনার সূচনা করলেন।
বালিজুড়ি গ্রামের চট্টোপাধ্যায় ও মুখোপাধ্যায় পরিবারের যৌথ পুজোটি প্রায় ৩৬০ বছরের পুরনো। এই পুজোর আয়োজন সম্পর্কে সপ্তর্ষি মুখোপাধ্যায় বলেন, চট্টোপাধ্যায় ও মুখোপাধ্যায় পরিবার একসঙ্গে মিলে এই পুজো সম্পন্ন করে। তিনি আরও জানান, এই পুজোয় প্রতিটি পরিবারের আলাদা পালা বা দায়িত্ব থাকে। তাঁদের পরিবারের আগের পালাটি পড়েছিল ১৯৮৬ সালে এবং দীর্ঘ ৪০ বছর পর ২০২৬ সালে ফের তাঁরা পুজোর মূল দায়িত্ব পালন করছেন। রবিবার সকালে গ্রামের যমুনা পুকুর থেকে ঘট ভরে নিয়ে আসার মাধ্যমে পুজোর মূল আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র মুখোপাধ্যায় বলেন, আদ্রা নক্ষত্রে কৃষ্ণা নবম্যাদি কল্পে মায়ের এই বোধন অনুষ্ঠিত হয়। বোধনের দিন থেকে শুরু করে টানা ১৫দিন ধরে মায়ের নিত্য ভোগ ও সন্ধ্যা আরতি চলতে থাকে এবং ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত মূল পুজোটি সম্পন্ন হয়।
গ্রামের প্রাচীনতম পুজোটি হল রায় পরিবারের, যা প্রায় ৪৭০ বছরের পুরনো প্রথা বহন করে চলেছে। শ্রীরামচন্দ্রের অকালবোধনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে পুলক রায় বলেন, এইসময় দেবলোকে দক্ষিণায়ন চলে, তাই দেবীর বোধন বা জাগরণের প্রয়োজন হয়। তিনি আরও জানান, গ্রামের প্রাচীনতম পুজো হওয়ার কারণে রীতি অনুযায়ী যমুনা পুকুর থেকে রায় পরিবারের মঙ্গলঘটই সবার প্রথমে আনা হয়।
এই প্রাচীন পুজোটি গ্রামবাসীদের কাছে নিছকই একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি একটি বিরাট পারিবারিক মিলন উৎসব। পম্পা মুখোপাধ্যায়ের কথায়, গ্রামের সবাই একসঙ্গে জড়ো হই। যাঁরা বাইরে রয়েছেন, তাঁরাও এই সময় আসেন। পারিবারিক মিলন উৎসব হয়ে ওঠে। সুনন্দা মুখোপাধ্যায় বলেন, এই ১৫দিনের পুজোর জন্য তাঁরা সারা বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকেন। অত্যন্ত নিষ্ঠাভরে পুজো করা হয়। শহুরে পুজোর জৌলুসের সঙ্গে গ্রামের পুজোর পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে ঝুমা মুখোপাধ্যায় বলেন, শহরে পুজোর জৌলুস থাকলেও গ্রামের সারল্য এবং পুজোর নিষ্ঠাই হল আসল পুজো।
সব মিলিয়ে, আড়ম্বর বা চাকচিক্যের চেয়ে ভক্তি, নিষ্ঠা এবং পারিবারিক মেলবন্ধনের জোরেই বালিজুড়ি গ্রামের এই শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গাপুজো আজও তার নিজস্ব ঐতিহ্য অম্লান রেখেছে।