বাঁশবেড়িয়া বললে প্রথমেই মনে পড়ে হংসেশ্বরী মন্দিরের কথা। কিন্তু ওই চত্বরেই রয়েছে আরও একটি প্রাচীন মন্দির। প্রায় ৩৫০ বছরের পুরনো অপরূপ টেরাকোটার সেই মন্দিরের নাম অনন্ত বাসুদেব মন্দির। চারচালা কাঠামোর উপর এই একরত্ন মন্দিরের চূড়া আট কোণবিশিষ্ট। এমন গঠনের মন্দির বাংলায় এখন বিরল। মন্দিরটি দৈর্ঘ্যে ৩৫ ফুট, প্রস্থ ৩২ ফুট। কিন্তু এই বিষ্ণুমন্দির কে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন? মন্দিরের ভিত্তিবেদির উপর একটি পাথরের ফলক রয়েছে। তাতে লেখা রয়েছে দু’লাইন শ্লোক— ‘মহীব্যোমাঙ্গ শীতাংসু গণিতে শক বৎসরে শ্রী রামেশ্বর দত্তেন নিরম্মে বিষ্ণুমন্দিরং।।’ হঠাৎ পড়লে ধাঁধা মনে হতে পারে। কিন্তু এর সমাধান করতে পারলেই জানা যাবে কত সালে তৈরি হয়েছে ওই মন্দির, আর প্রতিষ্ঠাতার নাম। মহী অর্থাৎ পৃথিবী (১), ব্যোম অর্থাৎ আকাশ বা শূন্য (০)। অঙ্গ অর্থাৎ ৬টি বেদাঙ্গ (৬)। এবং শীতাংসু বা চাঁদ (১)। সব মিলিয়ে ১০৬১। অঙ্কের বামাগতি অনুসারে ১৬০১ শকাব্দে অর্থাৎ ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে (শকাব্দের সাথে ৭৮ যোগ করলে খ্রিস্টাব্দ পাওয়া যায়) এই মন্দির স্থাপিত হয়েছিল। আর পরের লাইন থেকে স্পষ্ট বিষ্ণু মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন শ্রীরামেশ্বর দত্ত। রামেশ্বরের বাবা রাঘব দত্ত ১৬৪৯ সালে সম্রাট শাহজাহানের থেকে প্রচুর নিষ্কর জমি ও ২১টি পরগনার জমিদারি পান। তিনি বাঁশবেড়িয়াতে বসতি স্থাপন করেন। পরে রামেশ্বর সেখানে গড়ে তোলেন প্রাসাদ। রামেশ্বরের জমিদারিত্বে খুশি হয়ে সম্রাট আওরঙ্গজেব তাঁকে ১৬৭৩ সালে ‘রাজা মহাশয়’ উপাধি দেন। বিষ্ণুভক্ত রামেশ্বর তার কয়েক বছর পর তৈরি করেন এই মন্দির। মন্দিরের গর্ভগৃহে রয়েছে বাসুদেব মূর্তি। তবে রামেশ্বর প্রতিষ্ঠিত মূর্তি অনেকদিন আগেই হারিয়ে গিয়েছে। শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী নারায়ণ মূর্তির ডান দিকে রয়েছেন লক্ষ্মী। বাঁদিকে আরও একটি নারায়ণ মূর্তি। এই টেরাকোটা মন্দিরের কারুকাজ দেখে নাকি মুগ্ধ হয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তাঁর ছাত্র নন্দলাল বসু দীর্ঘদিন এই মন্দিরের টেরাকোটার ফলকগুলির ছবি এঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন। যার প্রভাব দেখা যায় সহজপাঠে নন্দলালের আঁকা ছবিতে। এই মন্দিরের শিল্প সুষমা দেখলে এখনও বিস্মিত হতে হয়। টেরাকোটার কাজে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি ও পৌরাণিক কাহিনি।



