নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: করোনা ভাইরাসকে শায়েস্তা করতে দেশবাসীকে থালা-বাসন বাজানোর নিদান দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এবার তাঁর জন্মদিন (১৭ সেপ্টেম্বর) পালনে সরকারি তরফে জারি করা হল নতুন নির্দেশ— ওই দিন সূর্যাস্তের পরে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধাপ্রাপকদের বাড়িতে জ্বালাতে হবে প্রদীপ! আর এই তালিকায় শুধু সরকারি ভাতাপ্রাপকরা নন, রয়েছেন কোভিড ভ্যাকসিন পাওয়া নাগরিকরাও। এহেন উদ্যোগের পোশাকি নাম, ‘আশীর্বাদ কি দিয়া’ বা ‘আশীর্বাদের প্রদীপ’। বুথে বুথে এমন নাগরিকদের চিহ্নিত করার আগাম নির্দেশও গিয়েছে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে। কিন্তু কেন? আসলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনসেবায় ২৫ বছর পূর্তি ও জন্মদিন উপলক্ষে আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে একমাসব্যাপী ‘সেবা সংকল্প অভিযান’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিজেপি। তারই সূচনা হবে এই প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে। এই কর্মসূচি সফল করতে মাঠে নেমে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত ডবল ইঞ্জিন সরকার। বৃহস্পতিবার নবান্ন সভাঘরে এই সংক্রান্ত প্রস্তুতি বৈঠকের পর, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আগামী ১৭ তারিখ, আমাদের পূর্বঘোষিত অন্নপূর্ণা দিবসের অনুষ্ঠানের পাশাপাশি, সূর্যাস্তের পর ‘আশীর্বাদ কি দিয়া’ অনুষ্ঠান অর্থাৎ প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচি পশ্চিমবঙ্গজুড়ে পালিত হবে। আমরা পশ্চিমবঙ্গের এক কোটির বেশি পরিবারকে এই কর্মসূচিতে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ জানা গিয়েছে, একইসঙ্গে এই কর্মসূচিতে যুক্ত করা হচ্ছে ৮০ হাজার স্কুলের পড়ুয়া-অভিভাবকদেরও। স্থানীয় বিধায়কদের একাজে সাহায্য করতে বলা হয়েছে। আর এই দুই সিদ্ধান্ত নিয়েই সৃষ্টি হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
বিরোধীদের প্রশ্ন, মানুষের ভোটে জিতে এসে সাধারণ নাগরিকদের করের টাকাতেই উন্নয়নমূলক প্রকল্প হাতে নেয় যে কোনো সরকার। সেই উপভোক্তাদেরকেই আবার সরকারি বা জনপরিষেবা পাওয়ার ‘কৃতজ্ঞতা’ জানাতে প্রদীপ জ্বালাতে হবে? এমন নিদান কেন? তেমনই স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের সন্ধ্যা সাতটার পর এই কর্মসূচিতে যোগদান করানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষানুরাগী ঐক্য মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক কিংকর অধিকারী। তাঁর বক্তব্য, ‘শিক্ষাঙ্গনে এই ধরনের কর্মসূচি কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই পুনর্বিবেচনার দাবি জানাচ্ছি।’ সরকারি সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছেন তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ। তিনি বলেন, ‘করোনাকালে থালা বাজানোর কথা মনে পড়ে গেল। রাজ্যের উপভোক্তাদের অন্ধকারে রেখে একদিন প্রদীপ জ্বালিয়ে কারও পেট ভরবে না। মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে কী করছেন প্রধানমন্ত্রী, জবাব দিন!’ রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য জানিয়েছেন, সরকারের এই কর্মসূচি বাংলার মানুষ এবং উপভোক্তারা গ্রহণ করবেন কি না, সেটা মানুষের উপরেই ছেড়ে দেওয়াই ভালো।
জানা গিয়েছে, এই অনুষ্ঠানের জন্য জেলা প্রশাসন ২ টাকা দরে প্রদীপ কিনবে। সেক্ষেত্রে এক কোটি পরিবারে তা বিতরণের খরচ হবে অন্তত ২ কোটি টাকা। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, কলকাতার গঙ্গা তীরবর্তী এলাকায় প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ছাড়াও সাজানো হবে ভিক্টোরিয়া, কালীঘাট মন্দির, নবান্ন, রাইটার্স সহ সরকারি এবং ঐতিহ্যশালী বাড়ি। আবার ‘বাচ্চো কে স্বপ্নো কা ভারত’ কর্মসূচিতে ২০৪৭-এর বিকশিত ভারতকে সামনে রেখে ড্রয়িং, কুইজ, তাৎক্ষণিক বক্তৃতা, বিতর্ক, রাইট-আপ নানা ধরনের অনুষ্ঠানে অংশ নেবে পড়ুয়ারা। এছাড়াও থাকছে ‘নব নমো সেবা গাথা’, ‘রঙ্গোলি রাষ্ট্র’, ‘বিকশিত ভারত সংকল্প যাত্রা’, ‘অঙ্গন কা উৎসব’ এবং ‘কাহানি বদলাও কি’। আগামী ৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর জনসেবার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলিকে নিয়ে কলকাতার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে বসবে ‘রাষ্ট্রীয় ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ’-এর আসর।