শুভদীপ রায়, কলকাতা: উৎসব অনুষ্ঠানে এক বাক্স মিষ্টি নিয়ে কারও বাড়ি যাওয়া। বাঙালির এই অভ্যাস চিরন্তন। যার মধ্যে রয়েছে সম্প্রীতির এক দীর্ঘ ইতিহাস। সেই মিষ্টির স্বাদ আর মানুষের সঙ্গে মানুষের মেলবন্ধনের গল্পই এ বার উঠে আসছে আহিরীটোলা সার্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতির মণ্ডপে। ৮৭তম বর্ষে তাদের ভাবনা, ‘মাধুরী মৈত্রী-অন্বেষণে’।
বাংলার মিষ্টির ইতিহাস বাঙালির সংস্কৃতির বিবর্তনের কথাও বলে। গুড়, চাল, নারকেল আর ক্ষীরের সাবেকি মিষ্টান্ন থেকে ছানার সন্দেশ, রসগোল্লা কিংবা পান্তুয়া—সময়ের সঙ্গে বদলেছে মিষ্টির ধরন, বেড়েছে স্বাদের বৈচিত্র্য। তবে মিষ্টির সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক স্রেফ স্বাদের গণ্ডিতে আটকে নেই। পুজোর ভোগ থেকে বিজয়ার মিষ্টিমুখ, বিয়েবাড়ি থেকে জন্মদিন—আনন্দের নানা মুহূর্তে মিষ্টি যেন সম্পর্কের নিজস্ব ভাষা। ধর্ম, জাতি কিংবা সামাজিক পরিচয়ের ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে মিষ্টিমুখ করার এই অভ্যাসই হয়ে উঠেছে পারস্পরিক সৌহার্দের প্রতীক। আহিরীটোলার মণ্ডপে সেই চেনা জগতের মধ্য দিয়েই সম্প্রীতির বার্তা তুলে ধরার চেষ্টা করছেন শিল্পী মানস দাস ও তাঁর সহযোগীরা। থিম প্রসঙ্গে জানালেন, ‘একসময় এই আহিরিটোলায় গোয়ালাদের বাস ছিল। সেই সূত্রে মিষ্টির সঙ্গে এই জায়গার বিশেষ সম্পর্ক। দুধ থেকে ছানা-ক্ষীর এবং তা ব্যবহার করে মিষ্টি তৈরির গল্পই দেখানোর চেষ্টা করছি। এছাড়া মিষ্টির সঙ্গে সম্প্রীতির বিশেষ যোগ রয়েছে। সেই আঁচও মণ্ডপে এলে দর্শকরা পাবেন।’ প্রতিমাতেও থাকছে বিশেষ চমক। কোলে গণেশ নিয়ে দেবী এখানে মাতৃস্বরূপা। নির্মাণের দায়িত্বে সুব্রত মৃধা।
কয়েক পা এগোলেই আহিরীটোলা যুবকবৃন্দ। ৫৬ তম বর্ষে তাদের নিবেদন ‘শেষ বেলায় রবির আলোয়’। মণ্ডপ জুড়ে থাকবেন রবীন্দ্রনাথ। তবে তাঁর লেখা কবিতা বা গান নয়, বরং হাতে আঁকা ছবি। সরাসরি ছবি বললেও ভুল হয়। আসলে রবীন্দ্রনাথ লেখার মাঝে ভুল হলে খুব যত্ন নিয়ে তা কাটতেন। আলাদাভাবে সেই কাটাকুটিই শিল্প হয়ে উঠত। রবি ঠাকুরের কবিতা-উপন্যাসের সেই পাণ্ডুলিপি আর তার মধ্যে থাকা বিশেষ নকশার কাটাকুটি যুবকবৃন্দের মণ্ডপে ফুটিয়ে তুলছেন শিল্পী অভিজিৎ ঘটক। মণ্ডপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তৈরি হচ্ছে প্রতিমা।
অন্যদিকে, জগত মুখার্জি পার্কের মণ্ডপে এবার ভারতীয় নৃত্যের ইতিহাস। যার কেন্দ্রে রয়েছেন এমন এক শিল্পী, যাঁর হাত ধরে আধুনিক ভারতীয় নৃত্য পেয়েছিল নতুন পরিচয়। দুর্গাপুজোর ৯০তম বর্ষে তাদের নিবেদন ‘শঙ্করনামা’। কিংবদন্তি নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্করের জীবন, শিল্পভাবনা এবং ভারতীয় নৃত্যে তাঁর অবদানই এ বার মণ্ডপসজ্জার মূল অনুপ্রেরণা।
১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি মুক্তি পেয়েছিল উদয়শঙ্কর পরিচালিত পূর্ণদৈর্ঘ্যের হিন্দি ছবি ‘কল্পনা’। ভারতীয় নৃত্যকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই ছবি আজও চলচ্চিত্র ও নৃত্যের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা নিয়ে রয়েছে। সেই শিল্পীর সৃষ্টিশীল জগৎ এবং ভারতীয় নৃত্যের বিবর্তনকেই এ বার পুজোর মণ্ডপে তুলে ধরার পরিকল্পনা করেছে জগৎ মুখার্জি পার্ক। ভাবনাকে শিল্পের রূপ দেবেন অভিজিৎ ঘটক। তাঁর কল্পনায় মণ্ডপ হয়ে উঠবে এমন এক ক্যানভাস, যেখানে ধরা পড়বে ভারতীয় নৃত্যের নানা ধারা, ইতিহাস এবং উদয়শঙ্করের শিল্পীসত্তা। প্রতিমা শিল্পী অমল পাল। উদ্যোক্তাদের কথায়, উদয়শঙ্করকে নিয়ে পুজো মণ্ডপে এমন মাত্রায় কাজ আগে হয়েছে বলে জানা নেই। শিল্পীর পরিবারের সদস্যরাও আপ্লুত। দর্শকদেরও আশা করি ভালো লাগবে। আহিরীটোলা সর্বজনীনের প্রতিমা।



