নয়াদিল্লি ও মুম্বই: আপনি ভারতের নাগরিক? প্রমাণ কী? আধার কার্ড কিংবা ভোটার আইডি? না, একেবারেই নয়! সুপ্রিম কোর্টের মতে, নির্বাচন কমিশনই সঠিক। আধার কিংবা ভোটার কার্ড নাগরিকত্ব প্রমাণের চূড়ান্ত নথি হতে পারে না। অন্যান্য নথির সাপেক্ষে তা খতিয়ে দেখতে হবে। বিহারে ভোটার তালিকার স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) ইস্যুতে গোটা দেশ যখন তোলপাড়, সেই সময় কার্যত কমিশনের অবস্থানকেই মান্যতা দিল শীর্ষ আদালত। মঙ্গলবার বিচারপতি সূর্য কান্ত ও জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ সাফ জানাল, মূলত বিশ্বাসের অভাবে এসআইআর নিয়ে বিবাদের এই ইস্যুটি তৈরি হয়েছে। আর অন্য কিছু নয়। ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি কিংবা বাতিলের অধিকার রয়েছে কমিশনের।
শুধু সুপ্রিম কোর্ট নয়, বম্বে হাইকোর্টের একটি পর্যবেক্ষণও এদিন গোটা বিতর্কে নতুন ইন্ধন দিয়েছে। সেই মামলাটি অবশ্য এসআইআর সংক্রান্ত নয়, অনুপ্রবেশকারী এক বাংলাদেশির জামিনের আর্জির। সেই আবেদন খারিজ করতে গিয়ে বম্বে হাইকোর্টের বিচারপতি অমিত বোরকারের বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, ‘আধার, প্যান বা ভোটার কার্ড থাকলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ভারতের নাগরিক বলে প্রমাণ হয় না। এগুলি স্রেফ পরিষেবা গ্রহণের সময় বা কাউকে শনাক্ত করতে কাজে লাগে। নাগরিকত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে শেষ কথা বলবে সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট (১৯৫৫)।’ এতে বিতর্ক আরও বেড়েছে। তাহলে কোন কার্ড বা নথিতে প্রমাণ হবে ভারতীয় নাগরিকত্ব? এসআইআরের জন্য নির্ধারিত ওই ১১টি নথি? আতঙ্কে সাধারণ মানুষ।
বিষয়টি নিয়ে অবশ্য যথেষ্ট সতর্ক লোকসভায় তৃণমূলের মুখ্য সচেতক কাকলি ঘোষ দস্তিদার। তিনি বলেন, ‘এতদিন পর্যন্ত আমরা ওই নথিগুলিকে উপযুক্ত প্রমাণপত্র হিসেবে বিবেচনা করতাম। এখন আদালত যদি সেগুলিকে নাগরিকত্বের পরিচয় নয় বলে জানায়, তাহলে সেটাকে মান্যতা দিতে হবে।’ সিপিএম সাংসদ তথা আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের অবশ্য সাফ কথা, ‘এটা সাধারণ নিয়ম হতে পারে না। আধার কার্ড যদি গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে সরকার এর পিছনে কোটি টাকা খরচ করেছে কেন? আধার কার্ডের উপর নির্ভর করে তো রেশন, হাসপাতালে ভর্তি, মৃত্যুর শংসাপত্র সবই হচ্ছে!’
বিহারে কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে একঝাঁক আবেদন পেশ হয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। এদিন তার শুনানিতে কমিশন জানায়, বিহারের ভোটার সংখ্যা ৭.৯ কোটি। এর মধ্যে সাড়ে ছ’কোটি ভোটারকেই নিজেদের বা বাবা-মায়ের কোনও নথি পেশ করতে হয়নি।’ এর প্রেক্ষিতেই আবেদনকারী আরজেডি নেতা মনোজ ঝায়ের আইনজীবী কপিল সিবালকে শীর্ষ আদালত জানায়, ৭.৯ কোটির মধ্যে যদি ৭.২৪ কোটি ভোটার এসআইআর প্রক্রিয়ায় সাড়া দিয়ে থাকেন, তাহলে এক কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়ার তত্ত্ব খাটে না।’ সিবালের যুক্তি, বাবা-মায়ের বার্থ সার্টিফিকেট সহ অন্যান্য নথি সংগ্রহে সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে মানুষকে। বিচারপতি সূর্য কান্ত তখন বলেন, ‘বিহারে কারও নথি নেই, এটা সম্পূর্ণভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন বিবৃতি। বিহারে এই অবস্থা হলে দেশের অন্যান্য অংশে কী ঘটবে?’
এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে এদিন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের তরফে আপত্তি জানান প্রবীণ আইনজীবী অভিষেক সিংভি ও প্রশান্ত ভূষণ। সেই সঙ্গে মৃত, স্থানান্তর বা অন্য কেন্দ্রে নাম রেজিস্টার করা ৬৫ লক্ষ ভোটারের তথ্য সংক্রান্ত প্রশ্নও তোলেন। কমিশনের তালিকায় মৃত হিসেবে নাম থাকা ভোটারদের এদিন আদালতে হাজির করেন রাজনৈতিক অধিকারকর্মী যোগেন্দ্র যাদব। সিবাল যুক্তি দেন, একটি কেন্দ্রে দেখা গিয়েছে, ১২ জনকে কমিশন মৃত হিসেবে ঘোষণা করলেও তাঁরা জীবিত। কমিশনের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদী বলেন, খসড়া তালিকায় এধরনের কিছু ভুলত্রুটি থাকবেই। আজ, বুধবার ফের এই মামলার শুনানি। যদিও সুপ্রিম কোর্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছে, গোটা প্রক্রিয়ায় বেআইনি কিছু করা হয়েছে প্রমাণ হলে এসআইআর বাতিল করা হতে পারে। সেটা সেপ্টেম্বরের শেষে হলেও!