সৌগত গঙ্গোপাধ্যায়: জুলাইয়ের কড়া রোদ তখনও মাথার উপর। তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু জনস্রোতকে রোখার ক্ষমতা নেই সূয্যিমামার। সকাল ১১টায় গেট খুলতেই নিউ জার্সি স্টেডিয়াম চত্বর সেজে উঠেছিল নীল ও লাল রংয়ে। গ্যালারি ক্রমশ ভরে যায় হাজার হাজার পতাকা, জার্সি আর উত্তেজনায়। সেই উন্মাদনাই সঙ্গী সারাক্ষণ। বিশ্বকাপের ফাইনাল বলে কথা। আবেগ, উচ্ছ্বাস বাঁধনছাড়া তো হবেই!
স্থানীয় সময় দুপুর দেড়টায় শুরু হল সমাপ্তি অনুষ্ঠান। রোদ ঝলমলে আকাশের নীচে জায়ান্ট স্ক্রিনে ভেসে ওঠে কানাডা, মেক্সিকো এবং আমেরিকার ১৬টি শহরের ছবি। টরন্টো, মেক্সিকো সিটি, ভ্যাঙ্কুভার থেকে লস এঞ্জেলস— গোটা বিশ্বকাপের যাত্রা কয়েক মিনিটে জীবন্ত দর্শকের চোখে। তারপর শুরু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। স্টেজে প্রথম এলেন জেনিফার হাডসন। রোদের তেজ তখনও কমেনি, কিন্তু তাঁর কণ্ঠ যখন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীতের মুখরা গেয়ে উঠল, গোটা গ্যালারি স্তব্ধ। এমি, গ্র্যামি, অস্কার ও টনি পুরস্কার জয়ী শিল্পীর মধুর সুরে আচমকাই যেন থমকে গেল সময়।
পর মুহূর্তেই হইচই। সাদা ড্রেসে মঞ্চে উঠলেন স্পিড। কনটেন্ট ক্রিয়েটার স্টেজে ব্যাকভলি দিতেই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল তরুণ দর্শকরা। ফোন উঁচিয়ে ভিডিয়ো করার হিড়িক। আর্জেন্তাইন সমর্থকদের থেকে ধেয়ে এল কটূক্তিও। কারণ, আইশোস্পিড যে রোনাল্ডো ভক্ত আর চরম মেসি বিরোধী! চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্তিনার প্রতিটি ম্যাচেই বিপক্ষের জার্সি পরে গ্যালারিতে হাজির ছিলেন তিনি। স্কালোনি-ব্রিগেডের হার চেয়েছেন। অটো টিউনে গান গেয়েই গ্যালারি মাতালেন তিনি। একে একে এরপর মঞ্চে উঠলেন আমেরিকান গায়ক ও র্যাপার পোস্ট মালোন ও সোয়ে লি। মালোনের বিখ্যাত গান ‘সানফ্লাওয়ারে’র প্রথম কলিতেই ফুটবল অনুরাগীরা আত্মহারা। লি’র পাশাপাশি গোটা স্টেডিয়াম তাতে গলা মেলাল!
বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান শেষ হতেই মাঠে মেগা ফাইনালের প্রস্তুতি শুরু। ট্রফি হাতে মাঠে নামলেন মারিও কেম্পেস ও আন্দ্রে ইনিয়েস্তা। আর্জেন্তিনার ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক কেম্পেস আবার গ্যালারির দিকে উঁচিয়ে ধরলেন ট্রফি। ততক্ষণে সেন্ট্রাল স্টেজ নিয়ে ফেলেছেন টম ক্রুজ। ‘মিশন ইম্পসিবল’ সিনেমার স্টান্ট নয়, মাইক হাতে আবেগঘন বক্তব্য রাখলেন বিখ্যাত অভিনেতা। ‘আসুন এমন এক টুর্নামেন্টকে উদযাপন করি, যা পুরো বিশ্বকে এক সুতোয় বেঁধেছে। এটাই ফুটবল, একতা, শ্রেষ্ঠত্ব।’
প্রথমার্ধের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর ফের শুরু বিনোদন। সুপার বোলের আদলে আধঘণ্টার হাফটাইম শো। ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনাল্ডো ও রোনাল্ডিনহোর সঙ্গে গাড়িতে গান গাইতে গাইতে ঢুকলেন ম্যাডোনা। এরপর গিটার হাতে পারফর্ম করলেন জাস্টিন বিবার। তারপর লাস্যময়ী শাকিরা মাতালেন গ্যালারি। লাখ লাখ ডলারে কাটা টিকিট সার্থক।
১১ জুন শুরু হয়েছিল শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের লড়াই। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তা সমাপ্তির পথে। সঙ্গীত-আলো-উচ্ছ্বাসের পূর্ণ বৃত্তে তা থামল নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে। মেসি-লামিনে সেই উন্মাদনাকেই পৌঁছে দিলেন অন্য জগতে।